কারখানার বর্জ্যে কালো হাঁড়িধোয়া, হারিয়ে যাচ্ছে মাছ ও কৃষির সম্ভাবনা

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৫ দুপুর
  • ২৬১০ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
একসময় ছিল দেশি মাছের প্রাচুর্য, এখন ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ | দূষিত পানিতে চাষাবাদ ব্যাহত, কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় স্থানীয়রা

একসময় রুই, কাতল, মৃগেল, বোয়াল, চিতল, পুঁটি, মলা ও ঢেলাসহ নানা প্রজাতির মাছে ভরপুর ছিল নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার হাঁড়িধোয়া নদী। নদীর পানিতে গোসল, মাছ শিকার ও কৃষিকাজ ছিল আশপাশের মানুষের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু সেই নদীর চিত্র এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি কলকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য ও গৃহস্থালি আবর্জনায় দূষিত হয়ে পড়েছে নদীটি। কোথাও কোথাও পানি এতটাই কালচে হয়েছে যে, দেখলে আলকাতরা মেশানো বলে মনে হয়। কমেছে মাছের বিচরণ, ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ, ব্যাহত হচ্ছে কৃষিকাজ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নরসিংদীর মাধবদী, শেখেরচর ও পাইকারচর এলাকার পাওয়ারলুম ও বস্ত্র কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্যপানি হাঁড়িধোয়া নদীতে এসে পড়ছে। অনেক কারখানায় বর্জ্যপানি শোধনাগার বা ইটিপি ব্যবহার না করেই দূষিত পানি নদীতে ফেলা হচ্ছে বলে তাঁদের দাবি। পাশাপাশি নদীর দুই পাড়ের জনপদ ও বাজারের আবর্জনাও পানিতে মিশছে। দীর্ঘদিনের এ দূষণে নদীটি তার স্বাভাবিক পরিবেশ ও ঐতিহ্য হারাচ্ছে।

মাছ কমেছে, বাড়ছে দুর্গন্ধ

স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় হাঁড়িধোয়া নদীতে দেশি মাছের প্রাচুর্য ছিল। নদীর পানি ও মাছকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করতেন অনেকে। এখন দূষণের কারণে মাছের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কখনো কখনো মরা মাছ পানিতে ভেসে উঠতেও দেখা যায়।

বিশনন্দী ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, “একসময় হাঁড়িধোয়া নদীতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন দূষণের কারণে নদীতে মাছ নেই বললেই চলে। কখনো কখনো মাছ মরে ভেসে উঠতে দেখা যায়।”

তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন মিল-কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে ফেলার কারণেই পানির এমন অবস্থা হয়েছে।

নদীরক্ষা কমিটির নেতা প্রকৌশলী মাহফুজ সালমান বলেন, নদীটির আগের রূপ আর নেই। ছোটবেলায় এই নদীতে মাছ ধরেছেন, গোসল করেছেন। কিন্তু দূষণের কারণে নদীটি তার ঐতিহ্য হারিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা কুতুব উদ্দিন জানান, নদীর পানি থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে নদীর পাড় দিয়ে চলাচল করাও কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

রামচন্দ্রদীর বাসিন্দা রোহেল সিকদার বলেন, হাঁড়িধোয়া নদী একসময় মিঠাপানির মাছের জন্য পরিচিত ছিল। রুই, কাতল, মৃগেল, পুঁটি, চিতল, বোয়াল, মলা, ঢেলা ও চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। দল বেঁধে মানুষ মাছ ধরতে আসতেন, নদীর পাড়ে বসে আড্ডা দিতেন। এখন সেই পরিবেশ আর নেই।

দূষিত পানিতে ব্যাহত কৃষিকাজ

নদীর দূষণ শুধু মাছ ও জলজ পরিবেশের ক্ষতি করছে না, প্রভাব ফেলছে কৃষিতেও। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আগে নদীর পানি ব্যবহার করে আশপাশের জমিতে সেচ দেওয়া যেত। কিন্তু পানি কালো হয়ে যাওয়ায় ও দুর্গন্ধ ছড়ানোয় কৃষকেরা এখন তা ব্যবহার করতে অনাগ্রহী। পানির সংকটে কিছু জমিতে চাষাবাদ বন্ধ রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তাঁরা।

তবে নদীর পানির দূষণের মাত্রা, কৃষিজমির ওপর এর প্রকৃত প্রভাব এবং জলজ প্রাণীর ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে কোনো পরীক্ষাগারভিত্তিক প্রতিবেদন স্থানীয়দের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়নি।

পানির প্রবাহ কমে নদী এখন খালের মতো

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাঁড়িধোয়া নদী বিশনন্দী ইউনিয়নের মেঘনা ঘাট এলাকা থেকে শুরু হয়ে খাগকান্দা ইউনিয়নের মেঘনা ঘাটে গিয়ে মিশেছে। নদীটির প্রকৃত নাম মেঘনার হাঁড়িধোয়া নদী। একসময় নদীকে কেন্দ্র করে আশপাশের মানুষের মাছ ধরা, কৃষিকাজ ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা পরিচালিত হতো।

কিন্তু বর্তমানে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর অনেক অংশ খালের মতো হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে বর্জ্য ও আবর্জনা যুক্ত হয়ে দূষণ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

নদী পুনরুদ্ধারে প্রশাসনের উদ্যোগ

আড়াইহাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুর রহমান বলেন, “হাঁড়িধোয়া নদীর বিষয়ে আমরা এর আগে নরসিংদীর জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলেছি। নদীটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রশাসনিকভাবে চেষ্টা চলছে।”

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ, শিল্পকারখানার বর্জ্য শোধন নিশ্চিত এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে হাঁড়িধোয়ার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হবে। পাশাপাশি নদীর পানির গুণগত মান পরীক্ষা করে দূষণের উৎস চিহ্নিত করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad