হাবিপ্রবিতে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবনা: অধিকার আদায়, নেতৃত্ব বিকাশ নাকি সংস্কারের দাবি?

  • শাহিন রেজা,মাল্টিমিডিয়া ইনচার্জ
  • আপলোড সময় : ৩০ মে ২০২৬, ০৩:৪৭ দুপুর
  • ২৩৪১৪ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

হাবিপ্রবিতে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবনা: অধিকার আদায়, নেতৃত্ব বিকাশ নাকি সংস্কারের দাবি?



দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি) ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে নানা মত ও প্রত্যাশা। কেউ ছাত্ররাজনীতিকে নেতৃত্ব বিকাশ ও অধিকার আদায়ের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বর্তমান রাজনৈতিক চর্চার সীমাবদ্ধতা ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরছেন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক জুলাই আন্দোলনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে ছাত্রসমাজের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

হাবিপ্রবির ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আশিক মনে করেন, ছাত্ররাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। তার ভাষায়, ছাত্ররাজনীতি শিক্ষার্থীদের দায়িত্ববোধ, নেতৃত্বগুণ, সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক চর্চার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দেয়। তবে এটি অবশ্যই সহিংসতা ও ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে।

একই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান নূর ছাত্রসংসদভিত্তিক রাজনীতির পক্ষে মত দেন। তিনি বলেন, বাস সংকট, অতিরিক্ত ক্রেডিট ফি ও সেশনজটের মতো সমস্যাগুলো সমাধানে অধিকাংশ ছাত্রসংগঠনের কার্যকর ভূমিকা চোখে পড়ে না। তার মতে, নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক ছাত্রসংসদই শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হতে পারে।

২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার জিহাদ ছাত্ররাজনীতির ইতিবাচক ও নেতিবাচক—উভয় দিকই তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ছাত্ররাজনীতি তরুণদের নেতৃত্ব ও সংগঠন পরিচালনার দক্ষতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে। তবে ক্ষমতার অপব্যবহার, সহিংসতা ও ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা ছাত্ররাজনীতির মূল লক্ষ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

অন্যদিকে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আল মামুনের মতে, ক্যাম্পাসের ছাত্রসংগঠনগুলো শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যার চেয়ে পারস্পরিক বিরোধ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক দ্বন্দ্বে বেশি ব্যস্ত। ফলে ক্লাসরুম, ল্যাব, শিক্ষক ও পরিবহন সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পাচ্ছে না।

২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী পারভেজ বসুনিয়া ছাত্ররাজনীতিকে গণতান্ত্রিক চর্চার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে এমন রাজনৈতিক পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে এবং রাজনীতি শিক্ষার্থীদের কল্যাণ ও নেতৃত্ব বিকাশে ভূমিকা রাখবে।

একই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এটিএম সিফাতুল্লাহ মূল্যবোধভিত্তিক ছাত্ররাজনীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, ছাত্ররাজনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত নৈতিকতা, নেতৃত্ব ও সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তোলা। গণরুম, গেস্টরুম কিংবা র‌্যাগিংয়ের মতো নেতিবাচক সংস্কৃতি শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করে।

২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নেওয়াজ শরীফ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিক্ষার্থীবান্ধব উদ্যোগের কারণে কিছু ছাত্রসংগঠন ইতিবাচকভাবে আলোচনায় এসেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠনগুলো সমন্বিতভাবে শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে কাজ করবে।

২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ শাকিলের মতে, ছাত্ররাজনীতি ক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার না হয়ে গবেষণা, জ্ঞানচর্চা ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্র হওয়া উচিত। তিনি ছাত্রসংসদভিত্তিক সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।

এদিকে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আসাদ ইকবাল বলেন, শিক্ষার্থীরা বর্তমানে এমন ছাত্ররাজনীতি প্রত্যাশা করেন, যা শিক্ষা, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হবে। তার মতে, ছাত্রসংগঠনগুলোর উচিত শিক্ষার্থীদের প্রকৃত চাহিদা ও সমস্যাগুলো অনুধাবন করে কাজ করা।

শিক্ষার্থীদের মতামত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশই ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও তারা সহিংসতা, দলীয় আধিপত্য ও ব্যক্তিস্বার্থনির্ভর চর্চার পরিবর্তে শিক্ষাবান্ধব, জবাবদিহিমূলক, মূল্যবোধভিত্তিক ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রত্যাশা করছেন। তাদের প্রত্যাশা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে উঠুক, যেখানে নেতৃত্ব বিকাশ, অধিকার আদায়, গণতান্ত্রিক চর্চা ও শিক্ষার পরিবেশ সমানভাবে গুরুত্ব পাবে।





কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad