হেক্সার স্বপ্ন থেকে হারের হেক্সা: কেন বারবার বিশ্বকাপে মুখ থুবড়ে পড়ছে ব্রাজিল?

  • প্রথম দর্পণ,স্পোর্টস ডেক্স
  • আপলোড সময় : ০৮ জুলাই ২০২৬, ১১:৪০ দুপুর
  • ১৬০৭৯ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হলুদ-সবুজ জার্সি একসময় প্রতিপক্ষের মনে ভয় জাগাত, সমর্থকদের মনে জাগাত অদম্য আত্মবিশ্বাস। কিন্তু সময় বদলেছে। ইতিহাসের গৌরব আজও অটুট থাকলেও বর্তমানের বাস্তবতা ব্রাজিলের জন্য কঠিন ও নির্মম। ২০২৬ বিশ্বকাপেও শিরোপার স্বপ্ন ভেঙে আবারও বিদায় নিতে হয়েছে সেলেসাওদের। ফলে টানা ছয়টি বিশ্বকাপ ধরে ট্রফিশূন্য থাকার হতাশাজনক অধ্যায় আরও দীর্ঘ হলো।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে ব্রাজিলজুড়ে সবচেয়ে আলোচিত শব্দ ছিল ‘হেক্সা’—ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তব হয়নি। বরং ‘হেক্সা’ শব্দটি এবার নতুন অর্থে ফিরে এসেছে—টানা ছয় বিশ্বকাপ শিরোপা জিততে না পারার বেদনাদায়ক রেকর্ড হিসেবে।

মাঝমাঠে সৃজনশীলতার সংকট

আধুনিক ফুটবলে মাঝমাঠই একটি দলের নিয়ন্ত্রণকক্ষ। সেখান থেকেই তৈরি হয় আক্রমণের ছন্দ, রক্ষণের ভারসাম্য এবং ম্যাচের গতি। কিন্তু এবারের ব্রাজিল দলে সেই জায়গাতেই ছিল সবচেয়ে বড় ঘাটতি।

লুকাস পাকেতার অনুপস্থিতিতে মাঝমাঠ ও আক্রমণের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে ওঠেনি। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি কিংবা মাতেউস কুনহারা গতিময় ফুটবলার হলেও তারা স্বাভাবিকভাবে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণকারী মিডফিল্ডার নন। ফলে আক্রমণগুলো হয়েছে বিচ্ছিন্ন, পূর্বানুমানযোগ্য এবং কার্যকারিতা হারিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে।

গোলদাতার অভাব বড় দুর্বলতা

ব্রাজিলের আরেকটি দীর্ঘদিনের সমস্যা হলো একজন নির্ভরযোগ্য স্ট্রাইকারের অভাব। বিশ্বমানের উইঙ্গারের অভাব নেই, কিন্তু প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে নিয়মিত গোল করার মতো একজন প্রকৃত নম্বর নাইন এখনও গড়ে ওঠেনি।

রিচার্লিসন, কুনহা কিংবা অন্যরা প্রতিভাবান হলেও ধারাবাহিক গোলস্কোরার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। অন্যদিকে শীর্ষ দলগুলোর আক্রমণের কেন্দ্রে রয়েছে বিশ্বমানের ফিনিশার। ফলে ব্রাজিল সুযোগ তৈরি করলেও গোলে রূপ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে বারবার।

ব্যক্তি নয়, প্রয়োজন দলগত দর্শন

দীর্ঘদিন ধরেই ব্রাজিল ফুটবলে ব্যক্তিনির্ভর সংস্কৃতি প্রবল। একসময় পুরো দল আবর্তিত হতো নেইমারকে ঘিরে। নেইমারের যুগ শেষ হলেও সেই মানসিকতার পরিবর্তন হয়নি।

আধুনিক ফুটবলে ইউরোপের সফল দলগুলো যেখানে শক্তিশালী দলগত কাঠামো গড়ে তুলেছে, সেখানে ব্রাজিল এখনও ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। অথচ বর্তমান ফুটবলে শিরোপা জিততে হলে দলগত সংগঠনই সবচেয়ে বড় শক্তি।

সুযোগ নষ্টের মূল্য

বড় দলের পরিচয় শুধু সুযোগ তৈরি করা নয়, বরং কঠিন মুহূর্তে সেই সুযোগ কাজে লাগানো। এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিল কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ পেয়েও সেগুলো কাজে লাগাতে পারেনি।

চাপের মুহূর্তে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল এবং ফিনিশিংয়ের দুর্বলতা দলটির ব্যর্থতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বড় আসরে মানসিক দৃঢ়তার অভাবও চোখে পড়েছে স্পষ্টভাবে।

কোচ বদলেছে, বদলায়নি ফল

গত দুই দশকে ব্রাজিল একের পর এক কোচ পরিবর্তন করেছে। কিন্তু ফলাফলে তেমন পরিবর্তন আসেনি। এতে স্পষ্ট, সমস্যাটি শুধু কোচিং বেঞ্চে নয়; বরং ফুটবল কাঠামো, খেলোয়াড় তৈরির ধারা এবং দল নির্বাচনের দর্শনেও রয়েছে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা।

অনেক ক্ষেত্রেই বর্তমান ফর্মের চেয়ে অতীতের খ্যাতি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি সৃজনশীল মিডফিল্ডার ও কার্যকর স্ট্রাইকার তৈরির চেয়ে উইঙ্গার তৈরির দিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়েছে।

সামনে কী করণীয়?

বিশ্বকাপে ব্যর্থ হলেও কোচ কার্লো আনচেলত্তির প্রতি আস্থা রেখেছে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন। আগামী বিশ্বকাপ পর্যন্ত দায়িত্বে থাকছেন ইতালিয়ান এই কোচ।

তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ব্রাজিলের ফুটবল দর্শনে পরিবর্তন আনা। মাঝমাঠে নতুন সৃজনশীল খেলোয়াড় গড়ে তোলা, রক্ষণভাগ আরও শক্তিশালী করা, নির্ভরযোগ্য গোলদাতা খুঁজে বের করা এবং দল নির্বাচনে শুধুমাত্র বর্তমান পারফরম্যান্সকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হতে পারে নতুন পথচলার ভিত্তি।

একসময় ব্রাজিলের জার্সি প্রতিপক্ষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করত। এখন সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হলে ইতিহাসের গৌরব নয়, বর্তমানের বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েই নতুন করে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। কারণ বিশ্ব ফুটবলে অতীত সম্মান এনে দেয়, কিন্তু শিরোপা জিতিয়ে দেয় বর্তমানের পারফরম্যান্স।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad