আষাঢ়ের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে শুরু হয়েছে ভয়ংকর ‘আফাল’-এর তাণ্ডব। উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে ভেঙে যাচ্ছে বসতভিটার মাটি, ঝুঁকিতে পড়ছে ঘরবাড়ি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান। দিন-রাত আতঙ্কে কাটছে হাওরপাড়ের মানুষের জীবন। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কয়েকটি পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে, ফলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
টাঙ্গুয়ার হাওরের বাসিন্দা রিপা বেগম বলেন, তার কাঁচা ঘরের পেছনের ভিটা ইতোমধ্যে আফালে বিলীন হয়ে গেছে। আরেকটু ভাঙন হলে পুরো বসতঘরই ধসে পড়তে পারে। স্বামী পেশায় জেলে হলেও উত্তাল ঢেউয়ের কারণে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না। ফলে পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। তিনি সরকারি সহায়তার দাবি জানান।
তাহিরপুর উপজেলার পাঠাবুকা গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও আফালের ঢেউয়ে বাড়ির পেছনের মাটি ধসে যাচ্ছে। ভাঙন ঠেকাতে বাঁশ, কচুরিপানা ও মাটিভর্তি বস্তা ব্যবহার করলেও সেগুলোও পানির তোড়ে ভেসে গেছে। ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকলে বসতভিটা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে ভাদ্র-আশ্বিন মাসে আফালের প্রকোপ দেখা গেলেও এখন আষাঢ়ের শুরুতেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, হাওরের নাব্যতা কমে যাওয়া এবং হিজল-করচ বন উজাড় হয়ে যাওয়ায় প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে অপেক্ষাকৃত ছোট ঢেউও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কারণ হচ্ছে।
জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ইতোমধ্যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। তাহিরপুরের রতনশ্রী গ্রামে আফালের আঘাতে পাকা ঘর, গোয়ালঘর ও বাথরুম ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। পাটাবুকা গ্রামে প্রতিদিনই বাড়ির উঠোন ও ভিটা ভাঙছে। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে অন্তত ২০টি বাড়ি হুমকির মুখে রয়েছে। ধর্মপাশার বালিজুড়ী ইউনিয়নের রাজাপুর, চকিয়াচাপুর, রায়পুর ও হিজলা গ্রামে ৫ থেকে ৭ ফুট উচ্চতার ঢেউ বাড়ির দেয়ালে আছড়ে পড়ছে। তাহিরপুর, ধর্মপাশা, মধ্যনগর, দোয়ারাবাজার ও শাল্লা উপজেলায় পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক।
শনির হাওরের শিক্ষক শরীফ উদ্দিন বলেন, প্রবল ঢেউয়ের কারণে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসতে পারছে না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ফলে এমন পরিস্থিতি এখন প্রায় নিয়মিত হয়ে গেছে। পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় রোগীদের হাসপাতালে নেওয়াও অত্যন্ত দুরূহ হয়ে উঠেছে।
মধ্যনগর বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তিতাস রায় বলেন, হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা প্রতিবছরই প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে পড়াশোনা চালিয়ে যায়। তবে বর্ষা মৌসুমে আফালের কারণে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি কমে যায়, যা শিক্ষার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মফিজির রহমান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় তাৎক্ষণিকভাবে বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ চলছে। সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোও নজরদারিতে রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে এ বিষয়ে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এমদাদুল হক জানান, ছাতক পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুরমা নদীর ষোলঘর পয়েন্টে পানি এখনও বিপৎসীমার ২৭ সেন্টিমিটার নিচে থাকলেও আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কয়েকটি স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে স্বল্পমেয়াদি বন্যার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, আফালের ক্ষয়ক্ষতি থেকে হাওরবাসীকে রক্ষায় ‘ক্রিলিপ’ নামে একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। সুনামগঞ্জসহ পাঁচ জেলায় প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই এর কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান জানান, আফালে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে প্রতিটি উপজেলায় ইউএনওর নেতৃত্বে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তারা মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছেন। এছাড়া জেলায় ১ হাজার ৩১১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে মাইকিং করে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হবে।

শাহিন রেজা,মাল্টিমিডিয়া ইনচার্জ