তিনি হজরত মুহাম্মদ ﷺ—মানবতার শিক্ষক, রহমতের নবী এবং আল্লাহর সর্বশেষ রাসুল।
আগমনের বার্তা ছিল নূরেররাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জন্মের সঙ্গে নূরের একটি বর্ণনা জড়িয়ে আছে। তাঁর মা আমিনা বিনতে ওয়াহাবের সঙ্গে সম্পর্কিত এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি এমন একটি নূর দেখেছিলেন, যার আলোয় শামের প্রাসাদগুলো আলোকিত হয়েছিল। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত একটি হাদিসেও তাঁর মায়ের এমন নূর দেখার কথা উল্লেখ রয়েছে।
এই বর্ণনা কেবল একটি অলৌকিক আলোর কথা নয়—মুসলিমদের কাছে এটি ছিল নবীজির আগমনের মাহাত্ম্য ও ভবিষ্যৎ হেদায়াতের প্রতীকী ইঙ্গিত। মক্কার একটি ঘর থেকে যে আলো ছড়িয়ে পড়ার কথা ছিল, তার প্রভাব একসময় আরব ছাড়িয়ে পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পৌঁছে যায়।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের কল্পনায় সেই দৃশ্য আরও আবেগময় হয়ে উঠেছে—
‘যেন উষার কোলে রাঙা রবি দোলে, তোরা দেখে যা আমেনা মায়ের কোলে।’
আমিনার কোলে তখন শুধু একটি শিশু নয়; মুসলিমদের বিশ্বাসে, সেখানে ভবিষ্যতের এক নতুন ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল।
মক্কার ঘরে নতুন আলোশেষ রাতের দিকে আমিনা বিনতে ওয়াহাবের ঘর আলো করে জন্ম নিলেন মুহাম্মদ ﷺ। তাঁর জন্মের সময় ও স্থান সম্পর্কে ইসলামী ইতিহাসে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। তবে মুসলিম ঐতিহ্যে তাঁর জন্মকে মানবতার জন্য রহমত ও হেদায়াতের সূচনাপর্ব হিসেবে দেখা হয়।
তাঁর জন্মের সময় আরব সমাজ ছিল নানা ধরনের সামাজিক ও নৈতিক সংকটে জর্জরিত। গোত্রীয় সংঘাত, শিরক, জুলুম ও সামাজিক বৈষম্য ছিল তৎকালীন সমাজের বাস্তবতা। এমন এক সময়ে জন্ম নিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের জন্য হেদায়াতের পথ উন্মুক্ত করবেন।
কোরআনে তাঁকে বলা হয়েছে ‘সমস্ত জগতের জন্য রহমত’।
তাই তাঁর জন্ম মুসলিমদের কাছে কেবল একটি শিশুর পৃথিবীতে আগমন নয়; বরং মানবতার জন্য রহমত ও হেদায়াতের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
মায়ের জীবনে ফিরে এলো আনন্দস্বামী আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর আমিনা বিনতে ওয়াহাবের জীবন নেমে এসেছিল গভীর বেদনায়। সেই শোকের মধ্যেই তাঁর কোল আলো করে এলো সন্তান। শিশুটিকে ঘিরে তাঁর জীবনে যেন নতুন আশার সঞ্চার হলো।
মায়ের চোখে তখন একদিকে ছিল হারানোর বেদনা, অন্যদিকে সন্তানকে ঘিরে অপার মমতা। শিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি যেন ভুলে থাকতেন জীবনের দুঃখ-কষ্ট।
পরিবার ও প্রতিবেশীদের মধ্যেও শিশুটিকে ঘিরে তৈরি হয় আগ্রহ। তাঁর সৌন্দর্য ও কোমলতা মানুষকে আকৃষ্ট করত। মুসলিম ঐতিহ্যে এই শিশুই পরবর্তী সময়ে পরিচিত হন আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ ﷺ হিসেবে।
জন্মের সঙ্গে জড়ানো বিস্ময়কর বর্ণনানবীজি ﷺ-এর জন্মকে ঘিরে সিরাত ও দালায়িলের বিভিন্ন গ্রন্থে আরও কিছু বিস্ময়কর ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। এর মধ্যে পারস্যের সম্রাট কিসরার প্রাসাদ কেঁপে ওঠা ও চৌদ্দটি বারান্দা ভেঙে পড়ার বর্ণনা সবচেয়ে প্রসিদ্ধ।
কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় আরও বলা হয়েছে, পারস্যের অগ্নিমন্দিরে দীর্ঘদিন ধরে জ্বলতে থাকা আগুন নিভে গিয়েছিল এবং সাওয়া হ্রদের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল। কিসরার দরবারে একটি অদ্ভুত স্বপ্ন দেখার কথাও এসব বর্ণনায় রয়েছে।
তবে এসব ঘটনার বর্ণনা মূলধারার সহিহ হাদিসে সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই এগুলোকে নবীজির জন্মসংক্রান্ত প্রচলিত সিরাত-ঐতিহ্যের বর্ণনা হিসেবেই দেখা অধিক সতর্কতার বিষয়।
মুসলিম সংস্কৃতিতে এসব ঘটনার তাৎপর্য মূলত প্রতীকী—একদিকে পুরোনো অন্ধকার যুগের অবসান, অন্যদিকে তাওহিদ ও হেদায়াতের নতুন যুগের সূচনা।
নূরের প্রকৃত অর্থ হেদায়াতরাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আগমনের সবচেয়ে বড় ‘নূর’ ছিল হেদায়াতের আলো। কোরআনে এসেছে—
‘আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছে এক নূর এবং সুস্পষ্ট কিতাব।’
এই নূর কেবল চোখে দেখা আলো নয়; এটি হৃদয়কে আলোকিত করার আলো। মানুষের বিশ্বাস, চরিত্র ও জীবনকে বদলে দেওয়ার আলো।
মক্কার সেই সমাজ থেকে শুরু হওয়া পরিবর্তন একসময় মদিনায় বিস্তৃত হয়। এরপর তা ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র আরব এবং পরবর্তী সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ মানুষের সামনে তাওহিদের শিক্ষা তুলে ধরেছেন, অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন এবং মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর শিক্ষা আরবের বিচ্ছিন্ন গোত্রগুলোকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে একটি নতুন সমাজব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করে।
তাঁর আদর্শে মানুষ শিখেছে ন্যায়, দয়া, ক্ষমা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা।
মরুভূমির সেই ফুলের সুবাস আজওকবি কাজী নজরুল ইসলাম নবীজি ﷺ-এর আগমনকে সাহারার বুকে ফুটে ওঠা এক ফুলের সঙ্গে তুলনা করেছেন—
‘সাহারাতে ফুটল রে, রঙিন গুলে-লালা,
সেই ফুলেরই খোশবুতে আজ দুনিয়া মাতোয়ালা।’
কবির এই উপমায় ভালোবাসা ও ভক্তির গভীর প্রকাশ রয়েছে। ইতিহাসের দৃষ্টিতে অবশ্য এর তাৎপর্য আরও বিস্তৃত। কারণ মুহাম্মদ ﷺ-এর জীবন ও শিক্ষা শুধু তাঁর সময়ের আরব সমাজকেই প্রভাবিত করেনি; পরবর্তী শতাব্দীগুলোতেও কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাস, নৈতিকতা ও জীবনাচরণে গভীর প্রভাব রেখেছে।
তাঁর মাধ্যমে পৌঁছে যায় আল্লাহর শেষ ওহি। প্রতিষ্ঠিত হয় তাওহিদের আহ্বান। মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার, দয়া ও পারস্পরিক দায়িত্বের শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ে সমাজে।
তাই তাঁর জন্মের মাহাত্ম্য কেবল কোনো প্রাসাদ কেঁপে ওঠা কিংবা কোনো অলৌকিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছিল মানুষের হৃদয়ে।
একজন মানুষ এলেন—আর তাঁর মাধ্যমে একটি সমাজ বদলে গেল। সেই সমাজের পরিবর্তন প্রভাব ফেলল ইতিহাসে। আর সেই ইতিহাসের ধারায় কোটি কোটি মানুষের জীবন ও বিশ্বাস নতুন পথের সন্ধান পেল।
আরবের মরুভূমিতে ফুটেছিল একটি ফুল। তার সুবাস কোনো একটি জনপদে আটকে থাকেনি। যুগ পেরিয়ে সেই সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে।
সেই ফুলের নাম—মুহাম্মদ ﷺ।

মোঃ আল আমিন হোসেন,বার্তা সম্পাদক