ইউএনআইএফআইএল বিদায়ের পর দক্ষিণ লেবাননে ইউরোপীয় বাহিনী, আলোচনা শুরু

  • প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স
  • আপলোড সময় : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১৪ দুপুর
  • ৩০৫৮ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত।
দক্ষিণ লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী ইউএনআইএফআইএলের ম্যান্ডেট শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর বাহিনীটির ম্যান্ডেট শেষ হবে। এরপর শুরু হবে প্রত্যাহার প্রক্রিয়া। এ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য নিরাপত্তাশূন্যতা মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি নতুন সামরিক ও বেসামরিক মিশন গঠনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে।

ইইউর কূটনৈতিক সংস্থা ইউরোপিয়ান এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিস (ইইএএস) তিন বছরের একটি মিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। এর আওতায় লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী (এলএএফ) ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীকে (আইএসএফ) পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি সীমান্ত ও সামুদ্রিক নিরাপত্তায় সহায়তার কথা বলা হয়েছে।

ইইউ কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন উদ্যোগের উদ্দেশ্য ইউএনআইএফআইএলকে সরাসরি প্রতিস্থাপন করা নয়। বরং লেবাননের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করাই এর মূল লক্ষ্য।

এদিকে লেবাননে প্রায় প্রতিদিনই ইসরাইলি হামলার ঘটনা ঘটছে। দেশটির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড ইসরাইলের দখলে রয়েছে। এখনো প্রায় ৩ লাখ ৩৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত। এমন পরিস্থিতিতে চলতি সপ্তাহে আয়ারল্যান্ডে ইইউর প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে লেবানন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

ইউরোপীয় মিশন নিয়ে সংশয়

ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস মে মাসে বলেছিলেন, লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীকে সহায়তার জন্য ইউরোপীয়রা একটি মিশন গঠনে প্রস্তুত। তবে ইউএনআইএফআইএলের পুরো দায়িত্ব নেওয়ার জন্য নতুন ইউরোপীয় মিশন পাঠানোর বিষয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেছিলেন।

দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের হামলার কয়েক দিন পর ১৯৭৮ সালের ১৯ মার্চ ইউএনআইএফআইএল গঠন করা হয়। ২০০৬ সালে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর যুদ্ধের পর বাহিনীটির দায়িত্ব আরও বাড়ানো হয়।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৭০১ নম্বর প্রস্তাবের আওতায় যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ এবং দক্ষিণ লেবাননে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীর মোতায়েনে সহায়তার দায়িত্ব দেওয়া হয় ইউএনআইএফআইএলকে।

তবে বাহিনীটির ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ছিল। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, প্রতিবেদন তৈরি ও সহযোগিতা করতে পারত। কিন্তু ইসরাইলকে লেবানন থেকে প্রত্যাহারে বাধ্য করা কিংবা কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিরস্ত্র করার ক্ষমতা তাদের ছিল না।

ইসরাইলের অভিযোগ, ইসরাইল-লেবানন সীমান্তে হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো ঠেকাতে ইউএনআইএফআইএল ব্যর্থ হয়েছে। এর পর থেকেই বাহিনীটির ভবিষ্যৎ নিয়ে চাপ বাড়তে থাকে।

নতুন বাহিনীর ক্ষমতা কতটা?

ইউএনআইএফআইএলে কাজ করা এবং ইউনিভার্সিটি অব গ্যালওয়ের আইরিশ সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসের অধ্যাপক রেমন্ড মারফির মতে, নতুন ইউরোপীয় বাহিনীকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিত করা কিংবা হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা কম।

তাঁর মতে, নতুন বাহিনীর মূল কাজ হতে পারে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা। তবে নিজেদের সুরক্ষা ও দায়িত্ব পালনের জন্য তাদের পর্যাপ্ত সামরিক সক্ষমতা থাকতে হবে। এর মধ্যে অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা এবং নিজেদের দায়িত্বাধীন এলাকায় অস্ত্রের চলাচল ঠেকানোর সক্ষমতাও থাকতে পারে।

তবে ইউরোপীয় মিশনই একমাত্র সম্ভাব্য বিকল্প নয়। ইউএনআইএফআইএলের পরবর্তী ব্যবস্থা নিয়ে জাতিসংঘও পরিকল্পনা করছে। একটি প্রস্তাবে জাতিসংঘের ট্রুস সুপারভিশন অর্গানাইজেশনকে সীমিত দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জুনে নিরাপত্তা পরিষদের সামনে তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দেন। এসব প্রস্তাবে ৯০০ থেকে ৩ হাজার সেনা রাখার কথা বলা হয়। জুনে ইউএনআইএফআইএলে প্রায় ৭ হাজার সেনা দায়িত্ব পালন করছিলেন।

ইউএনআইএফআইএল চলে গেলে নিরাপত্তাশূন্যতার আশঙ্কা

লেবাননের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইমাদ সালামেয়ি আল-জাজিরাকে বলেন, ইউএনআইএফআইএল চলে যাওয়ার পর সাময়িক নিরাপত্তাশূন্যতা তৈরির ঝুঁকি ‘বেশ গুরুতর’। তাঁর মতে, এতে ইসরাইল সুবিধা পেতে পারে।

আন্তর্জাতিক কোনো বাহিনী না থাকলে ইসরাইল এমন একটি ব্যবস্থা চাইতে পারে, যেখানে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীকে ইসরাইলি বাহিনীর সঙ্গে আরও সরাসরি সমন্বয় করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতাকারী বা নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

সালামেয়ির মতে, এতে আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে পর্যবেক্ষণের পরিবর্তে লেবাননের বাহিনী ও লেবাননের ভূখণ্ডে অবস্থানকারী ইসরাইলি বাহিনীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সমন্বয় তৈরি হতে পারে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ইউএনআইএফআইএল চলে যাওয়ার পর যে বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি হবে, তা স্থায়ী হয়ে যেতে পারে। এতে পরবর্তী সময়ে নতুন কোনো শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আলোচনা চলছে। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, এসব আলোচনা ইসরাইলের হামলা এবং লেবাননের ভূখণ্ডে তাদের অবস্থান বন্ধে খুব বেশি কার্যকর হয়নি।

ইউরোপীয় বাহিনী মোতায়েন হলেও ইসরাইলের অবস্থান বদলাবে কিংবা তারা লেবানন থেকে সরে যাবে—এমনটা মনে করেন না অধ্যাপক রেমন্ড মারফি। তাঁর মতে, এতে ইউরোপীয় বাহিনীর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

মূল সংকট রাজনৈতিক সমঝোতায়

জুনের শেষ দিকে ইসরাইল ও লেবানন একটি কাঠামোতে সম্মত হয়। এর আওতায় ‘পাইলট জোন’ তৈরির কথা বলা হয়। এসব এলাকা থেকে ইসরাইলি বাহিনী সরে যাবে এবং সেখানে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন হয়ে নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে। একই সঙ্গে হিজবুল্লাহর ফিরে আসা ঠেকানোর বিষয়টিও এর অংশ।

আগস্টের শুরুতে রোমে এ নিয়ে আলোচনা হলেও ‘পাইলট জোন’ সম্প্রসারণের বিষয়ে কোনো সমঝোতা হয়নি।

এ কারণে সম্ভাব্য ইউরোপীয় মিশনের সাফল্য শুধু বাহিনীর সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে না; এর জন্য প্রয়োজন হবে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা। শান্তিরক্ষী বাহিনী কোন দেশের হবে, তার চেয়ে তাদের উপস্থিতির শর্ত কী হবে—এ বিষয়টিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সালামেয়ির মতে, দুই পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া কোনো বাহিনী মোতায়েন করা হলে সেটি ইউএনআইএফআইএলের মতো একই সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে পারে।

ইসরাইল যদি লেবাননে অভিযান চালিয়ে যায় এবং দেশটির ভেতরে সেনা রাখে, আর হিজবুল্লাহ যদি বিদ্যমান কাঠামো প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে ইউরোপীয় বাহিনীর নিরপেক্ষতা দ্রুত প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

পারস্পরিক অঙ্গীকার, সম্মত নিয়ম এবং বাস্তবসম্মত প্রয়োগব্যবস্থা ছাড়া ইউএনআইএফআইএলের পরিবর্তে ইউরোপীয় মিশন মোতায়েন করা হলে শুধু নাম পরিবর্তন হবে; পুরোনো সমস্যাই ফিরে আসতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সালামেয়ি।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad