গ্রিস-ইসরাইল প্রতিরক্ষা চুক্তিতে তুরস্কের সঙ্গে উত্তেজনার নতুন সমীকরণ

  • প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৫ বিকাল
  • ৫১৭৮ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

প্রায় ৩ বিলিয়ন ইউরোর ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ প্রকল্প ঘিরে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে বাড়ছে সামরিক প্রতিযোগিতা

পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ইসরাইলের সঙ্গে গ্রিসের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। গত ৩১ আগস্ট দুই দেশ প্রায় ৩ বিলিয়ন ইউরোর একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। এর আওতায় গ্রিসের জন্য সমন্বিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলবে ইসরাইল। ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ নামে এ প্রকল্পে ডেভিডস স্লিং, বারাক এমএক্স, স্পাইডার ও বহুমুখী রাডারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা রয়েছে। চুক্তিটিকে দুই দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ চুক্তি শুধু অস্ত্র কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর মাধ্যমে গ্রিসের নিরাপত্তা কাঠামোয় ইসরাইলি প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহযোগিতার গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে। লেখক মুরাত আসলানও চুক্তিটির কৌশলগত দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, বিদেশি প্রযুক্তি ও সামরিক সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে গ্রিসের কৌশলগত স্বাধীনতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তুরস্ককে ঘিরে গ্রিসের সামরিক প্রস্তুতি

গ্রিসের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর অন্যতম প্রধান কারণ তুরস্কের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ। এজিয়ান সাগর ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সমুদ্রসীমা, দ্বীপগুলোর সামরিকীকরণ, মহীসোপান, জ্বালানি সম্পদ এবং সাইপ্রাস ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ রয়েছে।

গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোটাকিস সম্প্রতি এজিয়ান সাগরে আঞ্চলিক জলসীমা ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সম্প্রসারণের অধিকার নিয়ে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, গ্রিস কীভাবে নিজেদের সশস্ত্র করবে, সে বিষয়ে অন্য কারও অনুমতির প্রয়োজন নেই।

অন্যদিকে তুরস্ক পূর্ব এজিয়ান দ্বীপগুলোর সামরিকীকরণের বিরোধিতা করে আসছে। আঙ্কারার দাবি, গ্রিসকে ১৯২৩ সালের লওজান চুক্তি ও ১৯৪৭ সালের প্যারিস শান্তি চুক্তির বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ানও সতর্ক করে বলেছেন, অন্য দেশের ভূখণ্ড দখলের কোনো অভিপ্রায় তুরস্কের নেই; তবে নিজেদের অধিকার লঙ্ঘনও তারা মেনে নেবে না।

আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে প্রভাব

গ্রিস-ইসরাইল প্রতিরক্ষা সহযোগিতা পূর্ব ভূমধ্যসাগরের শক্তির ভারসাম্যে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইসরাইলের দৃষ্টিতে তুরস্কের সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সিরিয়ায় ইরানের প্রভাব কমে যাওয়া, রাশিয়ার আঞ্চলিক ভূমিকার পরিবর্তন এবং তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ইসরাইল পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নতুন কৌশলগত সমীকরণ গড়ে তুলতে চাইছে—এমন বিশ্লেষণ রয়েছে।

গত এক দশকে গ্রিস, ইসরাইল ও গ্রিক সাইপ্রিয়ট প্রশাসনের মধ্যে সামরিক, জ্বালানি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বেড়েছে। সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন প্রতিরোধ, বিমান প্রতিরক্ষা ও সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বিস্তৃত হয়েছে। এর ফলে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে একটি ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে ওঠার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

অন্যদিকে তুরস্কও সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন নিরাপত্তা অংশীদারত্ব গড়ে তুলছে। ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’সহ এসব উদ্যোগের কারণে পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণ পরস্পরের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হচ্ছে।

অস্ত্র বাড়লেই কি নিরাপত্তা নিশ্চিত?

গ্রিসের জন্য ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ সামরিক সক্ষমতা বাড়ালেও এর সঙ্গে কৌশলগত নির্ভরতার প্রশ্নও রয়েছে। আকাশ প্রতিরক্ষা, রাডার ও সামরিক কমান্ড কাঠামোর বড় অংশ বিদেশি প্রযুক্তিনির্ভর হলে সংকটের সময়ে প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনা নিয়ে নির্ভরতা তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া তুরস্ককে মোকাবিলায় গ্রিস যদি এমন কোনো আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হয়ে পড়ে, যার সিদ্ধান্ত গ্রহণে এথেন্সের নিয়ন্ত্রণ সীমিত, তাহলে সামরিক সক্ষমতা বাড়লেও কৌশলগত স্বাধীনতা কমার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী মিৎসোটাকিসের বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরাইলের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সৌদি আরব ও অন্যান্য আরব দেশের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করতে চায় এথেন্স। অর্থাৎ গ্রিসের লক্ষ্য কেবল ইসরাইলকেন্দ্রিক জোট গঠন নয়; বরং একাধিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করা।

ন্যাটোর দুই সদস্য, সংঘাত হলে চাপ বাড়বে

গ্রিস ও তুরস্ক—উভয় দেশই ন্যাটোর সদস্য। ফলে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাত তৈরি হলে তা কেবল দ্বিপক্ষীয় সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ন্যাটো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও বড় ধরনের কূটনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।

১৯৯৬ সালের কার্দাক সংকটের সময়ও যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়েছিল। ফলে এজিয়ান বা পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নতুন কোনো সংঘাত সৃষ্টি হলে তার প্রভাব পুরো অঞ্চল ছাড়িয়ে যেতে পারে।

প্রয়োজন রাজনৈতিক সমাধান

গ্রিস ও তুরস্কের দীর্ঘদিনের বিরোধের মূল বিষয়গুলো সামরিক শক্তি দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। এজিয়ান ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের সমুদ্রসীমা, সাইপ্রাস এবং দ্বীপগুলোর সামরিকীকরণ নিয়ে বিরোধ নিরসনে সামরিক ভারসাম্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংলাপ, আস্থা তৈরির উদ্যোগ এবং কার্যকর বিরোধ-নিষ্পত্তি কাঠামো প্রয়োজন।

‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ গ্রিসের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে পারে এবং একই সঙ্গে গ্রিস-ইসরাইল কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করতে পারে। তবে এর বিপরীতে তুরস্কের সঙ্গে নিরাপত্তা প্রতিযোগিতাও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও পাল্টা জোটের প্রবণতা বাড়তে পারে।

শেষ পর্যন্ত গ্রিসের সামনে প্রশ্নটি শুধু কতটা শক্তিশালী অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তোলা হবে, তা নয়; বরং এমন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো কীভাবে তৈরি করা যায়, যেখানে গ্রিস ও তুরস্ক তাদের বিরোধগুলো রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কারণ সামরিক শক্তি প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধের স্থায়ী সমাধান করতে পারে না।

সূত্র: ডেইলি সাবাহ ও এপি নিউজ




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad