বর্ষার হাত ধরে শরতের আগমন

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত।
প্রকৃতিতে শরৎ এসেছে সেই কবে। ভাদ্রের আকাশে তার নীলচে আভাস, মাঠের কিনারে কাশফুলের সাদা শির, বাতাসে শরতের কোমল ছোঁয়া। তবু বর্ষা এখনো পুরোপুরি বিদায় নেয়নি। আকাশের মেজাজে রয়ে গেছে তার রেশ।

এক মুহূর্তে রোদের ঝলকে চারপাশ আলোকিত হয়ে ওঠে, পরক্ষণেই কোথা থেকে কালো মেঘ এসে ঢেকে দেয় সূর্যের মুখ। দূরের দিগন্ত প্রথমে ধূসর, তারপর গাঢ় নীল-কালো হয়ে ওঠে। ভারী হয়ে আসে বাতাস। গাছের পাতাগুলো উল্টে রুপালি পিঠ মেলে ধরে। পাখিরা হঠাৎ নিচু হয়ে উড়তে শুরু করে। এরপর কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই আকাশ ভেঙে নামে বৃষ্টি।

ভাদ্রের প্রকৃতিতে শরৎ যেন নরম পায়ে হেঁটে বেড়ায়। ভোরের আলোয় আকাশের নীল ধীরে ধীরে স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। সকালের বাতাসে বর্ষার স্যাঁতসেঁতে গন্ধের সঙ্গে মিশে থাকে এক অচেনা নির্মলতা। মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের চিরচেনা পঙ্‌ক্তি—

‘আজি শরততপনে প্রভাতস্বপনে
কী জানি পরান কী যে চায়।’

শরতের এই আলোয় মানুষের মনও কি একটু বদলে যায় না? কোনো কারণ ছাড়াই মন উদাস হয়ে থাকে। মনে হয় কোথাও যেতে হবে—অথচ কোথায়, তা জানা নেই। কোনো অচেনা সৌন্দর্যের দিকে মন যেন ছুটে যেতে চায়।

রোদ-বৃষ্টির খেলায় ভাদ্রের দিন

রোদের ফাঁকে কাপড় মেলে দিয়ে ঘরে ফিরতে না ফিরতেই ঝমঝম বৃষ্টিতে ছাদ ভরে যায়। টিনের চালে বৃষ্টির আঘাত একটানা তীব্র শব্দ তোলে। আম, কাঁঠাল, শিরীষের পাতায় ছিটকে পড়ে জল। উঠোনের ধুলো মুহূর্তেই কাদায় মিশে যায়।

জানালার ওপারে নামে বৃষ্টির পর্দা। তার ভেতর দিয়ে গাছগুলো আবছা, ঘরগুলো মলিন, পথগুলো যেন হঠাৎ কোথাও হারিয়ে যায়।

বৃষ্টির শব্দে তখন পৃথিবীটাকেই অন্যরকম মনে হয়। চারপাশের পরিচিত শব্দগুলো থেমে যায়; শুধু বৃষ্টি কথা বলে—কখনো টিনের চালে, কখনো পাতার ওপর, কখনো মাটির বুকে।

মাটির বুক থেকে উঠে আসে গভীর কাঁচা গন্ধ—ভেজা পৃথিবীর নিজস্ব ঘ্রাণ। সেই গন্ধে কত পুরোনো বিকেল, কত হারিয়ে যাওয়া উঠোন, কত শৈশবের স্মৃতি যেন একসঙ্গে ফিরে আসে।

বৃষ্টি শেষে প্রকৃতির নতুন রূপ

বৃষ্টি থামলে দৃশ্যপটও বদলে যায়। পাতার ডগায় স্বচ্ছ জলবিন্দু কাঁপতে থাকে। কোথাও টুপ করে পড়ে, কোথাও অন্য পাতায় গড়িয়ে যায়। ভেজা ঘাসের ওপর নরম আলো এসে পড়ে। দূরের মাঠে জমে থাকা পানিতে ভেসে ওঠে আকাশের ছেঁড়া নীল।

কাশবনের সাদা ফুলগুলো বাতাসে একসঙ্গে দুলে ওঠে। মনে হয়, মাটির ওপর যেন ছোট ছোট ঢেউ উঠেছে।

আর তখনই শরৎকে সবচেয়ে কাছের মনে হয়।

কোথাও শেফালি ফুটেছে কি না জানা নেই; তবু মনে হয়, বাতাসের ভেতর তার গন্ধ লুকিয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথের গানটিও যেন সেই মুহূর্তে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—

‘ওই শেফালির শাখে
কী বলিয়া ডাকে বিহগ বিহগী
কী যে গায় গো।’বিলের জলে আকাশের ছায়া

খোলা মাঠে বসে আকাশ দেখতে ভালো লাগে। বিলের ধারে বসলে যেন আরও ভালো লাগে। বর্ষার পানি এখনো অনেকটা জমে আছে। তার ওপর মেঘের ছায়া ধীরে ধীরে সরে যায়। কোথাও শাপলার পাতা, কোথাও জলের বুক চিরে ওঠা ছোট মাছের বৃত্তাকার ঢেউ।

দূরে কোথাও কাদামাটির বাঁধ, তার ওপারে তালগাছের সরু কালো অবয়ব। বাতাস এলে বিলের পানি কেঁপে ওঠে। সেই কাঁপুনিতে ভেঙে যায় আকাশের প্রতিবিম্ব।

তখন মনে হয়, প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকা আসলে নিজের মনের ভেতর তাকিয়ে থাকার মতো। এই মেঘ, এই বৃষ্টি, এই হঠাৎ রোদ—সবকিছুর মধ্যেই মানুষের মনের কোনো না কোনো ছায়া লুকিয়ে থাকে।

মানুষের মনও তো এমনই। একটু আলোয় ভরে ওঠে, পরক্ষণেই মেঘে ঢেকে যায়। আবার কোনো এক অজানা হাওয়ায় সেই মেঘ সরে গিয়ে আলো ফিরে আসে।

নদীর পাড়ে শরতের অন্য ছবি

নদীর পাড়ের দৃশ্য আরও বিস্তৃত। স্রোতের ওপর ভাঙা রোদের টুকরো ছুটে বেড়ায়। দূরে একটি নৌকা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়; তার পেছনে জলের শরীরে দীর্ঘ দাগ কেটে থাকে। ওপারের চর কুয়াশার মতো আবছা। কোনো অচেনা পাখি ডেকে ওঠে।

বাতাসে মিশে থাকে কাশের গন্ধ, কাদার গন্ধ আর জলের সোঁদা ঘ্রাণ। তখন মনে পড়ে যায়—

‘আজি মধুর বাতাসে হৃদয় উদাসে,
রহে না আবাসে মন হায়
কোন কুসুমের আশে কোন ফুলবাসে
সুনীল আকাশে মন ধায় গো।’

বর্ষার বিদায়, শরতের আগমন

ভাদ্রের প্রকৃতি এমনই—স্থির নয়, অথচ অপূর্ব। একই সঙ্গে সে বহন করে বর্ষার বিদায় এবং শরতের আগমন। রোদ তার শরীরে আগুন জ্বালায়, মেঘ এসে সেই আগুন ঢেকে দেয়। বৃষ্টি মাটিকে ভিজিয়ে দেয়, আবার সেই ভেজা মাটির বুকেই জন্ম নেয় নতুন সবুজ।

শরৎ তাই শুধু নির্মেঘ নীল আকাশের ঋতু নয়। কখনো সে আসে বর্ষার ভেজা হাত ধরে, কখনো কালো মেঘের ফাঁক গলে, কখনো কাশফুলের সাদা দোলায়।

ভাদ্রের এই ভেজা-রৌদ্রোজ্জ্বল দিনগুলোতেও শরৎ নিঃশব্দে নিজের আগমনের কথা লিখে যায়—কাশফুলের সাদা অক্ষরে, শেফালির গন্ধে, ভেজা মাটির ঘ্রাণে, বিলের জলে কেঁপে ওঠা আকাশের প্রতিবিম্বে।

আর মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে সেই আগমনের সামনে—কখনো মাঠের ধারে, কখনো নদীর পাড়ে, কখনো জানালার পাশে। কোনো উত্তর খোঁজে না। শুধু দেখে ও শোনে।

অকারণেই তখন মনে হয়, প্রকৃতি যখন ঋতু বদলায়, মানুষের মনেও যেন অদৃশ্য কোনো কারণে ঋতু বদলে যায়।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad