বাঁধনদের বেঁধে রাখা যায় না; রাজু আলীম

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৮ দুপুর
  • ২৩৯ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের লালগালিচায় বাংলাদেশের সিনেমার প্রতিনিধিত্ব করছিলেন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। এর পরদিনই ইতালির মেস্ত্রে শহরের একটি পার্কে একদল বাংলাদেশির হাতে তাঁর হেনস্তা ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা শুধু একজন অভিনেত্রীর ওপর হামলা হিসেবে দেখলে এর গভীরতা অনুধাবন করা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, নারীর প্রতি অবমাননা, দলীয় উন্মাদনা এবং সবচেয়ে ভয়াবহভাবে—আইনের বদলে জনতার হাতে বিচার তুলে নেওয়ার সেই বিপজ্জনক প্রবণতা, যা বাংলাদেশে আমরা বহুবার দেখেছি। এবার সেই মানসিকতার ছায়া পৌঁছেছে ইতালিতেও।

বাঁধনের বক্তব্য ও পরে প্রকাশিত ভিডিও থেকে জানা যায়, ভাই ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পার্কে অবস্থানকালে একদল ব্যক্তি তাঁকে ঘিরে ধরে পানি, কোমল পানীয় ও ডিম ছুড়ে মারেন। তাঁর অভিযোগ, তাঁকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়, ফোন ফেলে দেওয়া হয় এবং কানের পাশে আঘাত করা হয়। ঘটনাস্থলে তাঁর ভাইয়ের ছোট শিশুটিও ছিল। বাঁধনের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীদের কয়েকজন নিজেদের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মী এবং বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হিসেবে পরিচয় দেন। তাঁকে ‘জুলাই জঙ্গি’ আখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক স্লোগান দিতে বাধ্য করার চেষ্টাও করা হয়। ঘটনার বেশ কিছু অংশের ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

ঘটনার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো, হামলাকারীরা শুধু হামলা করেই থামেনি; নিজেরাই সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ ও প্রচার করেছে। অর্থাৎ নিজেদের কর্মকাণ্ডের প্রমাণও তারা নিজেরাই রেখে গেছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বিষয়টি সামনে এনে বলেছেন, হামলাকারীরা নিজেরাই ঘটনা ব্যাপকভাবে প্রচার করেছে এবং নিজেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যও রেখে দিয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত রাজনৈতিক কর্মীদের নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে থাকার এবং নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের সম্মান ক্ষুণ্ন না করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাঁধনের ওপর হামলার লক্ষ্য শুধু তাঁর শরীর ছিল না; আক্রমণের কেন্দ্রে ছিল তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে অংশগ্রহণ এবং স্বাধীনভাবে নিজের অবস্থান প্রকাশের অধিকার। উপস্থাপক দীপ্তি চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরে বলেছেন, বাঁধনের কোনো রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া নেই। তিনি একজন সাধারণ নাগরিক এবং একই সঙ্গে নারী—এ কারণেই তাঁকে তুলনামূলক সহজ লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে বলে তাঁর মত।

এই বক্তব্যের তাৎপর্য রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরেই দলীয় পরিচয় অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তির নাগরিক পরিচয়কে ছাপিয়ে গেছে। নিজের দলকে সমর্থন করা, বিরোধিতা করা কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক করা গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। কিন্তু মতের বিরোধিতা কাউকে ঘিরে ধরে অপমান করা, গায়ে পানি বা ডিম ছুড়ে মারা, শারীরিকভাবে আঘাত করা কিংবা জোর করে স্লোগান বলানোর অধিকার দেয় না। মতের বিরুদ্ধে মত থাকবে, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুক্তি থাকবে। অপরাধ হলে পুলিশ ও আদালত আছে। জনতা যদি আদালতের ভূমিকা নেয়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রয়োজনই বা কোথায়?

অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফাহাম আব্দুস সালামের প্রতিক্রিয়াতেও ঘটনার প্রতি ক্ষোভ স্পষ্ট হয়েছে। বাঁধনকে ‘আমাদের লোক’ উল্লেখ করে তিনি তাঁর ওপর শারীরিক হামলার জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের আবেগ বোঝা গেলেও এখানেও সতর্ক থাকা জরুরি। একটি মবের জবাব আরেকটি মব দিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়; এতে বরং মবের সংস্কৃতিই আরও শক্তিশালী হয়। বাঁধনের ওপর হামলার প্রতিবাদ করতে গিয়ে আমরা যেন প্রতিশোধের আরেকটি সামাজিক অনুমোদন তৈরি না করি। বিচার চাইতে হবে, পাল্টা হামলা নয়।

চিত্রনায়িকা পরীমনির প্রতিক্রিয়ায় ঘটনার আরেকটি মানবিক দিক সামনে এসেছে। তিনি বিশেষ করে শিশুটির উপস্থিতির বিষয়টি তুলে ধরে প্রশ্ন করেছেন—হামলাকারীদের কাছে একটি শিশুর কান্নারও কি কোনো মূল্য নেই? প্রশ্নটি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে গিয়ে আমাদের বিবেকের কাছে পৌঁছে যায়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কেউ যতই ক্ষুব্ধ হোন না কেন, তাঁর সঙ্গে থাকা একটি শিশুকে সহিংসতার পরিবেশে টেনে আনার কোনো নৈতিক বা মানবিক যুক্তি থাকতে পারে না।

আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও সারজিস আলমও ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। আসিফ মাহমুদ ঘটনাটিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মীদের সহিংস মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখেছেন। সারজিস আলম বাঁধনের প্রতি সংহতি জানিয়ে হামলাকারীদের কঠোর সমালোচনা করেছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনের এই প্রতিক্রিয়াগুলো গুরুত্বপূর্ণ। তবে ঘটনাটিকে শুধু জুলাই বনাম আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর সামাজিক তাৎপর্য আড়াল হয়ে যায়। প্রশ্নটি আরও বড়—বিদেশের মাটিতেও কি একজন বাংলাদেশি নাগরিক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে নিরাপদ নন?

ইতালির ভেনিস অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট আলবের্তো স্তেফানি ঘটনাটিকে গুরুতর উল্লেখ করে বাঁধনের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মানুষের রাজনৈতিক মত, নাগরিক অবস্থান বা সামাজিক ভূমিকার কারণে কাউকে আক্রমণ বা ভয় দেখানো গ্রহণযোগ্য নয়। মেস্ত্রের বাঙালি সম্প্রদায়ের কাছ থেকেও তিনি স্পষ্ট নিন্দা প্রত্যাশা করেছেন। ইতালির সংবাদ সংস্থা আনসা জানিয়েছে, ঘটনাটি তদন্ত করছে ভেনিসের দিগোস। ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টাও চলছে। ফলে বিষয়টি এখন আর শুধু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ইতালির আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থারও বিষয় হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে বিব্রতকর বিষয় হলো, একজন বাংলাদেশি অভিনেত্রী আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেশের একটি সিনেমা নিয়ে গিয়েছিলেন। বিশ্বের অন্যতম বড় চলচ্চিত্র আয়োজনের শহরে বাংলাদেশের পরিচয় হওয়ার কথা ছিল সিনেমা, শিল্প ও সাংস্কৃতিক সাফল্যের মাধ্যমে। অথচ একই শহরের অন্য প্রান্তে কিছু বাংলাদেশি তাঁকে ঘিরে ধরে নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষোভের প্রকাশ ঘটালেন। যে দেশে তাঁরা বসবাস করেন, সেই দেশের আইনকেও যেন তুচ্ছ করা হলো। হামলার দৃশ্য ধারণ, তা প্রচার এবং নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় ঘোষণা—সবকিছুতেই এক ধরনের আত্মতুষ্টির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

বাঁধন পরে বলেছেন, তাঁকে ভয় দেখিয়ে দমানো যাবে না। আইনি প্রক্রিয়া শেষ না করে তিনি দেশে ফিরতে চান না বলেও জানিয়েছেন। স্থানীয় পুলিশের কাছে অভিযোগ করার কথাও বলেছেন তিনি। এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রতিশোধের বদলে তিনি আইনের পথ বেছে নিয়েছেন। তাঁর ওপর হামলার প্রতিবাদের সবচেয়ে কার্যকর পথও সেটিই—ইতালির তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া, অভিযুক্তদের শনাক্ত করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা।

বাঁধনের ঘটনা আমাদের আরও একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে—দেশ বদলালেই কি রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা বদলে যায়? পাসপোর্ট বদলালেই কি মবের মানসিকতা বদলায়? ইউরোপে বসবাস করেও কেউ যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘিরে ধরে অপমান করার অধিকার নিজের হাতে তুলে নেয়, তাহলে সমস্যাটি শুধু তার রাজনৈতিক মতাদর্শে নয়; নাগরিক বোধেরও সংকট সেখানে রয়েছে।

গণতন্ত্র কেবল ভোট দেওয়ার অধিকার নয়। গণতন্ত্রের গভীরে রয়েছে ভিন্নমত সহ্য করার অভ্যাস, প্রতিপক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মানসিকতা এবং অপরাধের বিচার রাষ্ট্রের হাতে ছেড়ে দেওয়ার সংস্কৃতি।

আজ বাঁধন আক্রান্ত হয়েছেন বলে আমরা প্রতিবাদ করছি। কাল অন্য কোনো শিল্পী, সাংবাদিক, শিক্ষক, রাজনৈতিক কর্মী কিংবা সাধারণ নাগরিক ভিন্নমতের কারণে আক্রান্ত হতে পারেন। আক্রান্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় আমাদের পছন্দ না হলে আমরা কি তখনও প্রতিবাদ করব? এই পরীক্ষার উত্তরই একটি সমাজের গণতান্ত্রিক চরিত্র নির্ধারণ করে।

বাঁধনের ওপর হামলার নিন্দা তাই শুধু একজন অভিনেত্রীর পক্ষে দাঁড়ানো নয়। এটি মবের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং নাগরিক স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো। ভেনিসে বাংলাদেশের যে পরিচয় সামনে আসার কথা ছিল, কয়েকজনের উন্মত্ততায় তা যেন কলঙ্কিত না হয়।

শিল্পীকে শিল্প দিয়ে মোকাবিলা করতে হয়, যুক্তিকে যুক্তি দিয়ে—হাতে হাত তুলে নয়।

সবশেষে বিষয়টি খুব সরল। বাঁধন জুলাইয়ের পক্ষে ছিলেন, বিপক্ষে ছিলেন কিংবা কোনো দলের সমর্থক ছিলেন কি না—এসবের কোনো কিছুই তাঁকে আক্রমণ করার অধিকার কাউকে দেয় না। তিনি একজন নাগরিক, একজন শিল্পী। তাঁর রাজনৈতিক মতের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে সেই দ্বিমত প্রকাশের অসংখ্য বৈধ পথ রয়েছে। হামলার কোনো বৈধতা নেই।

আর যে সমাজ এই সীমারেখাটি ভুলে যায়, সেখানে মব কেবল রাস্তায় থাকে না; একদিন সেটি সীমান্ত পেরিয়েও যায়।

লেখক: রাজু আলীম, কবি, সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad