দক্ষিণ এশিয়ার সম্ভাবনাময় দেশ বাংলাদেশও এমন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রথাগত তড়িঘড়ি ও সাময়িক সমাধানের পথ থেকে বেরিয়ে দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই ও কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে রাষ্ট্রের মনোযোগ এখন স্পষ্ট। জাতীয় সংসদে উঠে আসা সরকারের বিভিন্ন মহাপরিকল্পনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, পরিবেশবান্ধব সবুজ শক্তিতে রূপান্তর এবং মেগা প্রকল্পে প্রশাসনিক সুশাসন ও আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার মধ্য দিয়ে দেশের উন্নয়ন-দর্শনে পরিবর্তনের সূচনা হচ্ছে।
উন্নয়নের নতুন সংজ্ঞাবাংলাদেশের উন্নয়ন এখন আর শুধু বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কত মেগাওয়াট বাড়ল—সেই হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সুযোগ নেই। উন্নয়ন কতটা টেকসই, জাতীয় রাজস্ব ও মানুষের অর্থ কতটা সাশ্রয় করছে, সংকটের সময়ে জ্বালানি সরবরাহ কতটা নিরাপদ থাকছে এবং বড় প্রকল্পের সুফল সাধারণ মানুষ, কৃষক, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তার জীবনে কতটা পৌঁছাচ্ছে—এসব প্রশ্নও এখন গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও সরকারের পরিকল্পনা পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গভীর সমুদ্রে নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, সমুদ্রের ২৬টি ব্লকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে দেশে ১৫০টি নতুন কূপ খনন, দেশীয় গ্যাসের প্রকৃত মজুত নিরূপণে বিস্তৃত এলাকায় ২ডি ও ৩ডি সাইসমিক জরিপ, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথকে আধুনিক ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে উন্নীত করা, ঢাকা-কুমিল্লা সরাসরি কর্ডলাইন নির্মাণ, পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক ট্রেন চালু এবং ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য ও সবুজ উৎস থেকে পাওয়ার লক্ষ্য—সব মিলিয়ে এটি দীর্ঘমেয়াদি আত্মনির্ভরশীলতার একটি পরিকল্পিত রূপরেখা।
যোগাযোগ অবকাঠামোয় গতিযেকোনো দেশের অর্থনীতিতে যোগাযোগব্যবস্থা রক্তনালির মতো গুরুত্বপূর্ণ। পরিবহনব্যবস্থা স্থবির হলে অর্থনীতির গতি কমে যায়। বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদন, আমদানি-নির্ভর কাঁচামাল এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে ঢাকা-চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক করিডোরের গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই পথে দেশের বিপুল পরিমাণ পণ্য ও মানুষ চলাচল করে।
তাই ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথকে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে উন্নীত করা এবং ঢাকা থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত সরাসরি কর্ডলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে যাতায়াতের সময় ও পরিবহন ব্যয় কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
এর সঙ্গে আধুনিক ইলেকট্রিক ট্রেন যুক্ত হলে দেশের পরিবহনব্যবস্থায় পরিবেশবান্ধব পরিবর্তনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। যাত্রীদের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেও গতি আসবে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দ্রুত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পৌঁছানো সম্ভব হলে শিল্পের পরিবহন ব্যয় কমতে পারে। এর সুফল শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের কাছেও পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তা কেন গুরুত্বপূর্ণযোগাযোগ অবকাঠামোর চাকা সচল রাখা এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন অব্যাহত রাখার জন্য সবচেয়ে জরুরি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ। বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি নিরাপত্তা জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।
গ্যাস বা বিদ্যুৎ সরবরাহে সাময়িক বিঘ্নও শিল্প উৎপাদন, শ্রমিকের কর্মঘণ্টা এবং রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। অতীতে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দেশের শিল্প খাতে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা এক বা দুটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি স্পষ্ট করেছে।
এই বাস্তবতায় মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে একটি আধুনিক স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে স্থলভিত্তিক টার্মিনালটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে বাড়তি সক্ষমতা তৈরি করতে পারে।
নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে জোরশুধু বিদেশ থেকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে এলএনজি আমদানি করে দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সংকট মোকাবিলা করা টেকসই সমাধান নয়। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং ভূরাজনৈতিক সংঘাত আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
তাই দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রসীমায় নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদের অনুসন্ধান বাড়ানো জরুরি। গভীর সমুদ্রে ২৬টি ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র বা বিডিং আহ্বান এবং স্থলভাগে অনশোর মডেল পিএসসি ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
২০৩০-৩১ সালের মধ্যে দেশে ১৫০টি নতুন গ্যাস কূপ খনন এবং বিস্তৃত এলাকায় আধুনিক সাইসমিক জরিপ পরিচালনার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের ভূগর্ভ ও সমুদ্রের তলদেশে থাকা সম্ভাব্য প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ সম্পদ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবুজ শক্তির দিকে রূপান্তরকার্বন নিঃসরণ কমানো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এখন শুধু জলবায়ু সম্মেলনের আলোচনার বিষয় নয়; বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০)’ প্রণয়ন করেছে। লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদিত বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ পরিচ্ছন্ন ও সবুজ উৎস থেকে নিশ্চিত করা।
এই পরিবর্তনে সৌরবিদ্যুতের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের কৃষিজমি সীমিত হওয়ায় বিশাল জমিতে সৌর প্যানেল স্থাপন সহজ নয়। তবে পোশাক কারখানা, সরকারি দপ্তর, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক ভবনের বড় বড় ছাদকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা গেলে বাড়তি জমি ছাড়াই প্রায় ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
এর পাশাপাশি খালি জমিতে সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ এবং ভাসমান সোলার প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার বাংলাদেশকে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমিয়ে আরও পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে পারে।
প্রকল্পে ফিরতে হবে শৃঙ্খলাপরিকল্পনা যতই আকর্ষণীয় হোক, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বৃদ্ধির পুরোনো সংস্কৃতি দূর করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন। বছরের পর বছর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো এবং এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যয় দ্বিগুণ-তিনগুণ হওয়ার অভিযোগ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে।
করদাতার অর্থ ভুল পরিকল্পনা, দুর্নীতি বা অবহেলায় অপচয় হলে উন্নয়নের প্রতি মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে এ সমস্যার পেছনে প্রকল্প প্রণয়ন, জমি অধিগ্রহণ, অর্থসংস্থান ও ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দুর্বলতার কথা তুলে ধরেছেন।
এ অবস্থায় সরকার ১৩ দফা নির্দেশনা জারি করেছে। প্রকল্প অনুমোদনের আগে বাস্তবসম্মত সমীক্ষা, আগেই জমি অধিগ্রহণের জটিলতা নিরসন, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং কর্মকর্তা বা ঠিকাদারের গাফিলতি প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা—এসব উদ্যোগ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফেরানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
মানুষের প্রত্যাশা, সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত প্রতিটি প্রকল্পের প্রতিটি টাকার যথাযথ হিসাব থাকবে। উন্নয়ন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজে আসবে—এটাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের প্রত্যাশাবাংলাদেশের উন্নয়ন এখন আর কেবল কয়েকটি মেগা প্রকল্প, ফ্লাইওভার কিংবা নতুন ভবনের দৃশ্যমান অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। মানুষের প্রত্যাশা এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিশ্চয়তা থাকবে না, কৃষক তার উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাবেন, ব্যবসায়ী দ্রুত ও কম খরচে পণ্য পরিবহন করতে পারবেন এবং তরুণদের জন্য তৈরি হবে কর্মমুখী অর্থনীতির সুযোগ।
জ্বালানি স্বাবলম্বিতা, দ্রুতগতির রেল যোগাযোগ, সবুজ শক্তির প্রসার এবং সরকারি অর্থের সুশৃঙ্খল ব্যবহারের সমন্বয় একটি নতুন উন্নয়ন-দর্শনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তবে পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করবে এর বাস্তবায়নে সততা, দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও কঠোর তদারকির ওপর।
এই মহাপরিকল্পনাগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ এশিয়ার একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি নয়, বরং আত্মনির্ভরশীল ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ উন্নত জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে—এমন প্রত্যাশা করাই যায়।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন

প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স