দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে ঢাকা

  • প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স
  • আপলোড সময় : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৭ বিকাল
  • ২২৮৯ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে নতুন কাঠামোয় পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিয়েছে ঢাকা। সাম্প্রতিক সরকারি বক্তব্য ও চুক্তি পর্যালোচনার উদ্যোগ থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তা হলো—ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়, বরং সম্পর্কের ভিত্তি, অগ্রাধিকার ও পারস্পরিক স্বার্থকে নতুন করে নির্ধারণ করতে চাইছে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে ঢাকার ঘোষিত অবস্থানের কেন্দ্রে রয়েছে জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক সম্মান এবং সরাসরি দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা।

১৩ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ‘রিসেট’ করতে চায় এবং নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনাকে গুরুত্ব দিতে চায়। তিনি বলেন, ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে হলে প্রথম বৈঠকটি দ্বিপক্ষীয় হওয়াই স্বাভাবিক। একই সঙ্গে সীমান্তে হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন উদ্বেগ কূটনৈতিক চ্যানেলে আন্তর্জাতিক আইন, সীমান্ত প্রটোকল ও বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আলোকে উত্থাপনের কথা জানান তিনি।

এর আগেই জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছিলেন, আগের সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি পর্যালোচনা করছে সরকার। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনাও এই পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে বলে তিনি জানান। তবে কোন চুক্তি বহাল থাকবে, কোনটি সংশোধিত হবে কিংবা কোনোটি বাতিল করা হবে—এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি। ফলে ‘১০১ চুক্তি বাতিল হচ্ছে’—এমন ব্যাখ্যার বদলে ‘১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা পর্যালোচনা করা হচ্ছে’—এটিই বর্তমান অবস্থার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এই পর্যালোচনার রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। নুরুল ইসলাম মনি স্পষ্ট করেছেন, ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে ঢাকার আগ্রহ রয়েছে; তবে সম্পর্ক পরিচালনায় বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। অর্থাৎ, নতুন অবস্থানের মূল বক্তব্য সম্পর্কের বিরোধিতা নয়, বরং সম্পর্কের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা।

চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর প্রসঙ্গটি এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশের এসব বন্দর ও সংশ্লিষ্ট নৌপথ ব্যবহার করে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পরিবহনের সুযোগ পায়। ২০১৫ ও ২০১৮ সালে এ বিষয়ে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সমঝোতা ও চুক্তি হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে এর বাস্তবায়নও হয়েছে। ভারতের সরকারি নথিতেও চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের ফলে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও ভারতের মূল ভূখণ্ডের মধ্যে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে কোনো বন্দর বা যোগাযোগ অবকাঠামো ব্যবহারের প্রশ্নকে কেবল দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক সম্পর্কের দৃষ্টিতে দেখলে এর অর্থনৈতিক দিকটি আড়ালে পড়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের জন্য প্রশ্ন হলো—এ ধরনের সুবিধা প্রদানের বিনিময়ে দেশ কী ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে, স্থানীয় অবকাঠামো ও পরিবহন ব্যবস্থার ওপর কী প্রভাব পড়ছে, বন্দর ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকার কতটা সুরক্ষিত হচ্ছে এবং একই সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সংযোগ থেকে বাংলাদেশ কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা নিতে পারে। ফলে পর্যালোচনার উদ্দেশ্য যদি হয় শর্তগুলোকে বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, তাহলে সেটি কেবল রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণেরও অংশ।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বাস্তবতা অবশ্য আরো বিস্তৃত। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌপথ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের আন্তঃনির্ভরতা রয়েছে। ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের বিদ্যুৎ সহযোগিতাও সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ এবং সীমান্তপারের বিদ্যুৎ বাণিজ্য ইতোমধ্যে কার্যকর। একইভাবে ইন্দো-বাংলাদেশ প্রটোকল রুট দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন ও ট্রানজিটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

পানি প্রশ্নটি আবার সম্পর্কের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা এবং এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের তথ্যেও চুক্তিটির ৩০ বছরের মেয়াদের কথা উল্লেখ রয়েছে। ফলে সামনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে পানি ব্যবস্থাপনা, অভিন্ন নদী, তিস্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরো গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হয়ে উঠতে পারে।

এই বাস্তবতায় ঢাকার নতুন নীতিকে ‘ভারতবিরোধী’ কিংবা ‘ভারতঘনিষ্ঠ’—এই দুই সরল কাঠামোর কোনো একটিতে সীমাবদ্ধ করলে বিষয়টির জটিলতা ধরা পড়বে না। বরং এটি একটি স্বার্থভিত্তিক কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাসের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি কেবল প্রতিবেশীর সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না; বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, সীমান্ত, নদী, যোগাযোগ, বিনিয়োগ, আঞ্চলিক বাজার এবং জাতীয় নিরাপত্তার সমন্বিত স্বার্থও সেখানে কাজ করে।

ঢাকার অবস্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া। সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের প্রশ্নে ঢাকা স্পষ্ট করেছে যে, বহুপক্ষীয় অনুষ্ঠানের পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে ভারত সফর হলে সেটি দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে হওয়াকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। হুমায়ুন কবিরও বলেছেন, উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে দ্বিপক্ষীয় সফরের মাধ্যমে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে।

এখানে ‘বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ’ ধারণাটির বাস্তব প্রয়োগই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় স্বার্থকে কার্যকর নীতিতে রূপ দিতে হলে প্রতিটি চুক্তি বা সমঝোতাকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে—চুক্তিটি বাংলাদেশকে কী দিয়েছে, কী দায়িত্ব তৈরি করেছে, অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতি কী, সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর এর প্রভাব কী, বাস্তবায়নে কী সমস্যা হয়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটি আগের মতোই প্রাসঙ্গিক কি না। একই সঙ্গে কোনো চুক্তি থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বা কৌশলগত সুবিধা থাকলে তা কেবল পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে করা হয়েছিল বলে বাতিল করার প্রশ্নও যুক্তিসঙ্গত নীতিগত পদ্ধতি হবে না।

অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য শুধু রাজনৈতিক অবস্থান যথেষ্ট নয়। বাণিজ্যে বৈচিত্র্য, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বিকল্প সক্ষমতা, নিজস্ব পরিবহন ও বন্দর অবকাঠামোর উন্নয়ন, আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশ এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক সম্প্রসারণ বাংলাদেশের আলোচনাকেন্দ্রিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। অর্থাৎ বহুমুখী বৈদেশিক সম্পর্কের উদ্দেশ্য কোনো একটি দেশকে অন্য কোনো দেশ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা নয়; বরং বাংলাদেশের নিজস্ব বিকল্প ও সক্ষমতা বাড়ানো।

ভারতও বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে থেকে যাচ্ছে। ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ সহযোগিতা ইতোমধ্যে একটি বিস্তৃত কাঠামো তৈরি করেছে। ফলে সম্পর্ক পুনর্গঠনের অর্থ হবে না বিদ্যমান আন্তঃনির্ভরতা অস্বীকার করা; বরং সেই আন্তঃনির্ভরতাকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ, স্বচ্ছ ও পারস্পরিক সুবিধাভিত্তিক কাঠামোয় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা।

১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা পর্যালোচনার উদ্যোগকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি নীতিগত পুনর্মূল্যায়নের অংশ হিসেবে দেখা যায়। এর চূড়ান্ত ফলাফল এখনো জানা যায়নি। কোন চুক্তি বহাল থাকবে, কোনটিতে সংশোধন আসবে কিংবা কোনো চুক্তি বাতিল হবে কি না—তা পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তবে বর্তমান বক্তব্যগুলো থেকে যে নীতিগত বার্তা পাওয়া যাচ্ছে তা হলো, ঢাকা দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দিচ্ছে, কিন্তু সেই সম্পর্ককে বাংলাদেশের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের কাঠামোর মধ্যেই পরিচালনা করতে চায়।

একটি স্থিতিশীল ও কার্যকর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য তাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত কে কার দিকে বেশি ঝুঁকল, তা নয়; বরং দুই দেশ কীভাবে পারস্পরিক স্বার্থ, সমতা, সার্বভৌমত্ব এবং বাস্তব অর্থনৈতিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে সম্পর্ককে আরো কার্যকর করতে পারে। ঢাকার সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো— জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতিকে বাস্তব আলোচনার সক্ষমতা, তথ্যভিত্তিক চুক্তি মূল্যায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা। সেই প্রক্রিয়া সফল হলে সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাংলাদেশের জন্য আরো কার্যকর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরির সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটর, টাইমস অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া টুডে, মিনিস্ট্রি অব পোর্টস শিপিং এন্ড ওয়াটারওয়েজ-ইন্ডিয়া, মিনিস্ট্রি অব এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স- ইন্ডিয়া ও দ্য ইনল্যান্ড ওয়াটারওয়েজ অথরিটি অব ইন্ডিয়া (আইডব্লিওএআই) ইত্যাদি।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad