বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে উদযাপিত হচ্ছে।

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫২ দুপুর
  • ৩৮৭১ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত
কম বেতন, পদোন্নতি জটিলতা ও চাকরির অনিশ্চয়তা; নন-এমপিও ও ইবতেদায়ি শিক্ষকদের দুর্ভোগ বেশি

জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান চালিকাশক্তি শিক্ষকরা। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষক কর্মরত। দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও বেতন-ভাতা, পদোন্নতি, চাকরির নিরাপত্তা, বদলি, অবসর সুবিধা ও কর্মপরিবেশসহ নানা ক্ষেত্রে এখনও বঞ্চনা ও বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। ফলে নানা সংকট নিয়েই পেশাগত জীবন কাটছে মানুষ গড়ার এই কারিগরদের।

দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে শিক্ষকদের কিছু সুযোগ-সুবিধা বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নন-এমপিও স্কুল-কলেজ এবং ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকরা সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি, অপর্যাপ্ত বাজেট এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার অভাব এ সংকটকে জটিল করেছে। এতে মেধাবীদের একটি অংশ শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছেন।

কম বেতন, বেশি চাপ

শিক্ষকদের সংকটের তালিকায় রয়েছে তুলনামূলক কম বেতন-ভাতা, পদোন্নতিতে জটিলতা, বদলির সীমাবদ্ধতা, অতিরিক্ত কাজের চাপ ও অনুকূল কর্মপরিবেশের অভাব। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসর সুবিধা পেতেও নানা হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে কিন্ডারগার্টেনের লক্ষাধিক শিক্ষক খুব কম বেতনে কাজ করলেও তাঁদের অনেকেরই চাকরির নিরাপত্তা নেই।

ইবতেদায়ি মাদরাসার পরিস্থিতিও একই রকম। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় অর্ধলাখ শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের মধ্যে রয়েছেন।

স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা জাতীয় শিক্ষক ফোরামের সভাপতি শেখ নজরুল ইসলাম মাহবুব বলেন, ইবতেদায়ি মাদরাসা জাতীয়করণের দাবিতে রাষ্ট্রপতি, স্পিকার, বিভিন্ন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও ১৮০ জন সংসদ সদস্যের ডিও লেটার দেওয়া হলেও এ বিষয়ে সরকারের দৃশ্যমান কর্মসূচি এখনও দেখা যাচ্ছে না।

জাতীয়করণের দাবি

এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবি জানিয়ে আসছেন। এ দাবিতে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনও হয়েছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতির আলোকে বর্তমান সরকারের কাছে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণের ঘোষণা প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।

শুধু বেসরকারি শিক্ষকরাই নয়, সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকদের মধ্যেও অসন্তোষ রয়েছে। এক শিক্ষক জানান, ১৬ বছর আগে দশম গ্রেডে যোগ দিয়ে এখনও একই অবস্থানে রয়েছেন। দীর্ঘ সময় চাকরি করেও গ্রেড পরিবর্তন হয়নি। তাঁদের বেশ কিছু দাবি সম্প্রতি সরকারের কাছে জানানো হলেও এখনো সমাধান হয়নি।

নন-এমপিওদের অনিশ্চয়তা

বিগত সরকারের সময়ে শিক্ষকরা আর্থিক বঞ্চনার পাশাপাশি গ্রেপ্তার ও নির্যাতনসহ নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন দাবি নিয়ে আন্দোলন জোরদার হয় এবং বেশ কিছু দাবি পূরণও হয়। তবে এখনো কিছু দাবি ঝুলে আছে।

সরকারের নতুন পে স্কেলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তির ঘোষণায় অনেকের মধ্যে স্বস্তি এলেও নন-এমপিওসহ অন্য শ্রেণির শিক্ষকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

শিক্ষক দিবসে ১০১ শিক্ষককে সম্মাননা

শিক্ষকদের এই বাস্তবতার মধ্যেই আজ সোমবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে শিক্ষকদের মর্যাদা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সুপারিশ গ্রহণের ২৮ বছর পর ১৯৯৪ সালে ইউনেসকো দিনটিকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। ২০২৬ সালে ওই সুপারিশের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবারের প্রতিপাদ্য—‘শিক্ষকদের পাশে : পেশার সুরক্ষা, মর্যাদা বৃদ্ধি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ার ৬০ বছর’।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আজ ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জাতীয় পর্যায়ে বিশ্ব শিক্ষক দিবস-২০২৬ উদযাপন করা হবে। অনুষ্ঠানে ১০১ জন শ্রেষ্ঠ শিক্ষককে সম্মাননা ও পুরস্কার দেওয়া হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন বলেন, শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে সরকার গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন জানান, এতদিন জাতীয় পর্যায়ে ১২ জন শিক্ষককে গুণী শিক্ষক হিসেবে সম্মাননা দেওয়া হতো। এবার প্রথমবারের মতো এ সংখ্যা বাড়িয়ে ১০১ করা হয়েছে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষার পাশাপাশি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও এ সম্মাননার আওতায় থাকবেন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে চিকিৎসা, কৃষি, প্রকৌশল, বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত ক্ষেত্রের শিক্ষকও নির্বাচিত হচ্ছেন।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রত্যাশা

বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ‘সুশিক্ষায় মেধাবী শিক্ষক’ প্রসঙ্গে গণিত, বিজ্ঞান, তৃতীয় ভাষা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরিসহ বিভিন্ন বিষয়ে মেধাবী তরুণদের শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহী করে তোলা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান ক্যাডার ও নন-ক্যাডার শিক্ষকদের পর্যায়ক্রমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা এখন এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের দিকে তাকিয়ে আছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি এবং শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান সেলিম ভূঁইয়া বলেন, গত বছর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিক্ষক সমাবেশে বিএনপি চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষকদের জাতীয়করণের চেয়েও বেশি সুযোগ দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তিনি শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানিয়েছিলেন। এখন সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।

তিনি বলেন, শিক্ষক দিবসে গুণী শিক্ষকদের ২ লাখ টাকা করে সম্মাননা দেওয়ার উদ্যোগ ইতিবাচক। একইভাবে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের বিষয়টিও সরকার ইতিবাচকভাবে দেখছে। তাঁর মতে, প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে জাতীয়করণ করা সম্ভব হলে শিক্ষকদের বহু সমস্যা, অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ কমে আসবে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও অনিশ্চয়তা

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও চাকরির নিশ্চয়তা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে নানা সমস্যার কথা বলছেন। এক সিনিয়র শিক্ষক জানান, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যক্তিকেন্দ্রিকভাবে পরিচালিত হওয়ায় শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ থাকে। নির্ধারিত সময় পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করেও অনেকের চাকরির নিশ্চয়তা থাকে না।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তুলনামূলক স্বস্তিতে থাকলেও তাঁদেরও বিভিন্ন দাবি রয়েছে। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সঙ্গে উপাচার্যদের সংলাপে গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং দেশ-বিদেশে সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর দাবি উঠে এসেছে।

অধিকার নিশ্চিতের পাশাপাশি নৈতিকতাও জরুরি

শিক্ষকদের বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিপরীতে কিছু শিক্ষকের অনিয়ম, দুর্নীতি, রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডও শিক্ষকসমাজের সামগ্রিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থী বা অন্যদের হাতে শিক্ষকদের হামলা, মারধর, লাঞ্ছনা ও হুমকির ঘটনাও ঘটছে।

আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের মহাসচিব অধ্যাপক এবিএম ফজলুল করিম বলেন, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হলে শিক্ষকদের অনেক সমস্যা ও সংকট দূর হতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষকসমাজকে দুর্নীতি ও অনৈতিকতা থেকে দূরে রাখতে অন্তত অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ দেন তিনি।

অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, কিছু শিক্ষক নীতি-নৈতিকতাবিবর্জিত কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ায় পুরো শিক্ষকসমাজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মর্যাদার আসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তাঁদের পেশাগত নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

শিক্ষাবিদ ও শিক্ষক নেতাদের মতে, শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার, আর্থিক নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে শিক্ষাব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। শিক্ষককে মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই হতে পারে বিশ্ব শিক্ষক দিবসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার।

তথ্যসূত্র: শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক সংগঠন ও নেতৃবৃন্দের বক্তব্য এবং প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট তথ্য।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad