স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর নদীভাঙনে সর্বস্ব হারালেও তাঁদের দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা কয়েকটি এলাকায় প্রতিরক্ষা প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো বা সমীক্ষার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
নড়াইলে তিন কিলোমিটারজুড়ে মধুমতীর ভাঙননড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার আমডাঙ্গা ও শিকারপুর গ্রামে মধুমতী নদীর ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙনে বসতভিটা ও ফসলি জমি হারাচ্ছেন মানুষ। একই সঙ্গে নবগঙ্গা নদীর ভাঙনে হুমকির মুখে পড়েছে কয়েকশ বছরের পুরোনো বড়দিয়া বাজার।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্ষা মৌসুমে মধুমতী নদীর স্রোত বাড়লে ভাঙনের তীব্রতাও বেড়ে যায়। গত এক দশকে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে শত শত একর ফসলি জমি, অসংখ্য বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা। গত প্রায় দুই মাস ধরে চলমান ভাঙনে নতুন করে নিঃস্ব হচ্ছেন অনেকে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ কুমার সাহা বলেন, নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে আমডাঙ্গা ও শিকারপুর এলাকায় ভাঙন বেড়েছে। কয়েক বছর ধরে বর্ষায় পানির আধিক্য ও তীব্র স্রোতে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। নদীভাঙনের পেছনে বালু উত্তোলনও অনেকাংশে দায়ী।
তিনি জানান, আমডাঙ্গা এলাকায় ১ হাজার ৭০০ মিটার স্থায়ী তীররক্ষা প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বড়দিয়া বাজার রক্ষায় ১৫০ মিটার অস্থায়ী ও ১৭০ মিটার স্থায়ী তীররক্ষা প্রকল্প গ্রহণের প্রস্তাব পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
পায়রার ভাঙনে পাঁচ গ্রামের অস্তিত্ব সংকটেপটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায় পায়রা নদীর ভাঙনে গত পাঁচ বছরে শত শত ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। ভাঙনের কারণে অন্তত ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। পাঁচটি গ্রামের অস্তিত্বও প্রায় বিলীন হওয়ার পথে। নদীগর্ভে গেছে কয়েকশ একর কৃষিজমি।
গত কয়েক মাসে উপজেলার মাধবখালী ইউনিয়নের রামপুর ও মির্জাগঞ্জ ইউনিয়নের পিপঁড়াখালী গ্রামে শতাধিক বসতঘর, দুটি জামে মসজিদ ও কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীতে বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
রামপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক হাওলাদার বলেন, ‘পায়রা নদীর গ্রাসে আমার বাড়িঘর তিনবার ভাইঙা গেছে।’
পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমরান হোসেন জানান, পায়রা নদীর ভাঙন রোধে ২০২৭ সালে একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন পাওয়া যাবে। এরপর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) বাস্তবায়নের জন্য বাজেট বরাদ্দ পাওয়া গেলে সিসি ব্লক দিয়ে তীর সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
পদ্মায় দুই মাসে বিলীন ২০০ একর জমিকুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলায় পদ্মা নদীর ভাঙনে গত দুই মাসে প্রায় ২০০ একর ফসলি জমি বিলীন হয়েছে। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলমান ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন পানচাষিরা। হুমকিতে রয়েছে এলাকার ঐতিহ্যবাহী কুচিয়ামোড়া পানবাজারও।
নদীগর্ভে জমি ও পানবরজ হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কয়েকশ কৃষক। অনেকেই জীবিকার তাগিদে ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কৃষিবিদ মাহমুদা সুলতানা জানান, ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত দুই ইউনিয়নের প্রায় ৩২০ জন কৃষকের তালিকা তৈরি করে জেলায় পাঠানো হয়েছে। তাঁদের সহায়তার বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসফাউদদৌলা বলেন, তিনি সরেজমিনে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন চলছে, যার মধ্যে তিন কিলোমিটার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। জরুরি ব্যবস্থা নিয়ে এ ভাঙন রোধ করা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।
স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অপেক্ষায় মানুষতিন জেলার নদীভাঙনের চিত্রে উঠে এসেছে একই সংকট—বসতভিটা, কৃষিজমি ও জীবিকার উৎস হারিয়ে মানুষের অনিশ্চিত জীবন। কোথাও প্রতিরক্ষা প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, কোথাও সমীক্ষা শেষ হওয়ার অপেক্ষা। কিন্তু এর মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে মানুষের শেষ আশ্রয়টুকুও।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আরও ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় স্থায়ী তীর সংরক্ষণ ও কার্যকর পুনর্বাসন উদ্যোগ এখন জরুরি।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক