আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া চতুর্থ প্রজন্মের ৯টি ব্যাংক বর্তমানে খেলাপি ঋণের হারে দেশের ব্যাংকিং খাতের শীর্ষে অবস্থান করছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে এসব ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ২০ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ টাকা ঋণের বিপরীতে ৫২ টাকারও বেশি আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
ব্যাংক খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, পরিচালনা পর্ষদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ, স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে ঋণ বিতরণ এবং কার্যকর তদারকির অভাব—এসব কারণেই খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। দীর্ঘদিন পুনঃতফসিল ও বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র আড়াল থাকলেও ২০২৪ সালে কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তনের পর প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আলোচ্য ব্যাংকগুলো হলো—মধুমতি, মিডল্যান্ড, ইউনিয়ন, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স (এসবিএসি), মেঘনা, পদ্মা, এনআরবি, গ্লোবাল ইসলামী এবং এনআরবি কমার্শিয়াল (এনআরবিসি) ব্যাংক।
পদ্মা ব্যাংকের দীর্ঘ সংকট
২০১৩ সালে কার্যক্রম শুরু করা পদ্মা ব্যাংক (তৎকালীন ফারমার্স ব্যাংক) শুরু থেকেই নানা অনিয়ম ও বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। অনুমোদনের আগেই অফিস স্থাপন ও জনবল নিয়োগ, রাজনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত সংগ্রহ এবং ঋণ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে মাত্র চার বছরের মাথায় ব্যাংকটি বড় সংকটে পড়ে।
পরিস্থিতির অবনতির পর ২০১৭ সালে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর পদত্যাগ করেন। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম শামীমকে অপসারণ করে। পরে ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি চারটি ব্যাংক ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) মূলধন সহায়তা দেয় এবং পরিচালনায় যুক্ত হয়।
২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি ফারমার্স ব্যাংকের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পদ্মা ব্যাংক। নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন চৌধুরী নাফিজ সরাফাত। তবে তার নেতৃত্বেও ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি; বরং অনিয়ম ও লোকসান বাড়তে থাকে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের চাপে তিনি পদত্যাগ করেন।
খেলাপি ঋণের হার
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চতুর্থ প্রজন্মের কয়েকটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর মধ্যে—
ইউনিয়ন ব্যাংক — ৯৬.৭৯%
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক — ৯৬.৪৬%
পদ্মা ব্যাংক — ৯০.৬৮%
এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক — ২২.৪৮%
এসবিএসি ব্যাংক — ১৮.৬১%
মিডল্যান্ড ব্যাংক — ৪.৩৭%
মধুমতি ব্যাংক — ২.৮২%
এক বছরে আরও বেড়েছে খেলাপি
২০২৫ সালের মার্চ শেষে চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ। একই বছরের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে ৫১ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছায়। আর ২০২৬ সালের মার্চ শেষে হার দাঁড়ায় ৫২ দশমিক ২০ শতাংশে।
অন্যদিকে, একই সময়ে দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ, চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। এতে এসব ব্যাংকের সম্পদের মান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ পুনরুদ্ধার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তারল্য ঝুঁকিও বাড়ছে
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চতুর্থ প্রজন্মের কয়েকটি ব্যাংকের অ্যাডভান্স-টু-ডিপোজিট রেশিও (এডিআর) এখনো ১০০ শতাংশের বেশি। মার্চ শেষে এ শ্রেণির ব্যাংকগুলোর গড় এডিআর ছিল ১০১ দশমিক ৬ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি তারল্য ঝুঁকি বাড়ার ইঙ্গিত দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত ঋণসীমার বাইরে ঋণ বিতরণের বিষয়টিও সামনে আসে।
প্রজন্মভিত্তিক খেলাপি ঋণের চিত্র
চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকের পর খেলাপি ঋণের হারে রয়েছে—
প্রথম প্রজন্মের ব্যাংক — ৩৪.৪০%
তৃতীয় প্রজন্মের ব্যাংক — ২৯.৮০%
দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যাংক — ১৯.২০%
পঞ্চম প্রজন্মের ব্যাংক — ৫%
খাতভিত্তিক খেলাপি ঋণ
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়—
ব্যবসা-বাণিজ্য — ৪৩.৮০%
শিল্প — ৩১.৯০%
নির্মাণ — ২৯.৯০%
কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন — ২৯.৯০%
পরিবহন — ২৫.৭০%
অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ — ১৫%
ভোক্তা ঋণ — ৭.১০%
ঋণের অঙ্কভেদে খেলাপির হার
এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণে খেলাপির হার ১৫ শতাংশ। এক কোটি এক টাকা থেকে ১০ কোটি টাকায় ২৬.৬০ শতাংশ, ১০ কোটি এক টাকা থেকে ২০ কোটি টাকায় ৪৫.১০ শতাংশ, ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকায় ৩৫.৭০ শতাংশ, ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকায় ৩৮.৯০ শতাংশ, ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকায় ৪৪.৭০ শতাংশ এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণে খেলাপির হার ৪২.৫০ শতাংশ।
ব্যাংকিং খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ অনুমোদন এবং কঠোর পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা ছাড়া এ সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক