ই-কমার্সে লাল সংকেত: আস্থাহীনতা, লোকসান ও বিনিয়োগ সংকটে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতার শঙ্কা

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫০ সকাল
  • ১৩৬৫৬ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

দেশের ই-কমার্স খাত বর্তমানে বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সংকুচিত হওয়া, গ্রাহকদের আস্থাহীনতা, বিনিয়োগ কমে যাওয়া, পরিচালন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে একসময় দ্রুত বিকাশমান এ খাতের প্রবৃদ্ধি এখন উল্লেখযোগ্যভাবে শ্লথ হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে নতুন উদ্যোক্তাদের আগ্রহও কমে এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতিগত অনিশ্চয়তা, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক চাপ, ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং অতীতে ঘটে যাওয়া প্রতারণার ঘটনাগুলোর প্রভাব এখনো কাটেনি। ফলে বাজার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই, কার্যক্রম সীমিত করা কিংবা পুরোপুরি ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার পথে হাঁটছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর নীতিগত সহায়তা, স্বচ্ছ লেনদেন ব্যবস্থা, গ্রাহক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনের মাধ্যমে আস্থা পুনরুদ্ধার করা গেলে এ খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। অন্যথায় দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় এই শিল্প দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতার মুখে পড়বে।

সংকটে শীর্ষ প্রতিষ্ঠানও

গত কয়েক মাসে দেশের শীর্ষস্থানীয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান দারাজসহ কয়েকটি প্ল্যাটফর্ম কার্যক্রম সংকুচিত করেছে। ধারাবাহিক লোকসানের কারণে ডেলিভারি হাব বন্ধের ঘটনাও ঘটেছে, যা সাধারণ ক্রেতা, মার্চেন্ট এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ডলারের উচ্চমূল্য, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পণ্য ডেলিভারি ও লজিস্টিক খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসপণ্যের ক্রয় কমে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ই-কমার্সে বিনিয়োগ কমে আসার প্রভাবও পড়েছে দেশের বাজারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা, ডিজিটাল প্রতারণা এবং গ্রাহকদের আস্থাহীনতা।

দারাজ নিয়ে মার্চেন্টদের ক্ষোভ

চীনা প্রযুক্তি জায়ান্ট আলীবাবা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান দারাজ ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে। বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় প্রতিষ্ঠানটি দেশের ই-কমার্স বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করে। তবে পরবর্তীতে মার্চেন্ট ও গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কারণে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আস্থা কমতে শুরু করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্চেন্ট বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনাই অনেকাংশে দায়ী। তার দাবি, ২০২০ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে হাব কমানো হয়েছে। সর্বশেষ শতাধিক হাবের মধ্যে ১৬টি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ১৪ জুন থেকে কার্যকর হয়েছে, যা সংকটের গভীরতাই প্রকাশ করছে।

জানা গেছে, ঢাকার চকবাজার-২, পল্টন ও সাভার এবং চট্টগ্রামের নিউমার্কেট হাবের বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হলেও বগুড়া, রংপুর, কুষ্টিয়া, বরিশাল, রাজশাহী, টাঙ্গাইল, বাগেরহাট, ময়মনসিংহ, জামালপুর, ফরিদপুর, মৌলভীবাজার ও সিরাজগঞ্জের হাবগুলোর কোনো বিকল্প নির্ধারণ করা হয়নি।

এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। দারাজের কাস্টমার কেয়ারেও যোগাযোগ করা হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

বিনিয়োগ কমাচ্ছে আলীবাবা

দারাজের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, মূল প্রতিষ্ঠান আলীবাবা গ্রুপ এখন ই-কমার্সের পরিবর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে দারাজকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভবিষ্যতে নতুন করে বিনিয়োগ বাড়ানো হবে না। চলতি জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের মধ্যে আয়-ব্যয় সমান (ব্রেক-ইভেন) পর্যায়ে পৌঁছাতে না পারলে আর কোনো ভর্তুকিও দেওয়া হবে না।

সূত্রটি আরও জানায়, বর্তমানে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের মাধ্যমে পরিচালন ব্যয়ের একটি অংশ মেটানো হচ্ছে। ব্যয় কমাতে বনানীর প্রধান কার্যালয়ের চারটি ফ্লোরের মধ্যে দুটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। একসময় প্রায় এক হাজার কর্মী থাকলেও বর্তমানে নিয়মিত কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৩০০; বাকিরা আউটসোর্সিং বা চুক্তিভিত্তিক।

এ ছাড়া মার্চেন্টদের পাওনা সময়মতো পরিশোধ না হওয়ায় পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বেতন-ভাতা নিয়ে অসন্তোষের কারণে ডেলিভারি কর্মীদের কর্মবিরতির ঘটনাও ঘটেছে।

ইভ্যালির ক্ষত এখনো কাটেনি

শুধু দারাজ নয়, আরও অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়ে কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ইভ্যালি অতিরিক্ত ক্যাশব্যাকের প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে আলোচনায় আসে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠাতা রাসেল ও তার স্ত্রী শামীমাকে আদালত দুই বছরের কারাদণ্ড দেন।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ ক্যাশ অন ডেলিভারি সুবিধা নিয়ে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করলেও বাজারে তেমন সাড়া পাচ্ছে না। গ্রাহকদের বকেয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়েও কার্যকর অগ্রগতি নেই।

শত শত কোটি টাকা আটকে

বাংলাদেশ মোবাইল ফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩২টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কাছে গ্রাহকদের পাওনা রয়েছে ৫৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৮টি প্রতিষ্ঠান এখনো অর্থ ফেরত দেয়নি।

এ ছাড়া আটটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৬৬১ কোটিরও বেশি টাকা পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আনন্দের বাজারের বিরুদ্ধে প্রায় ৩০০ কোটি, ই-অরেঞ্জের বিরুদ্ধে ২৩২ কোটি এবং ধামাকার বিরুদ্ধে ১১৬ কোটি টাকার অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমানে দেশে তিন লাখের বেশি ই-কমার্স ও এফ-কমার্স প্রতিষ্ঠান থাকলেও নিবন্ধিত মাত্র ১ হাজার ৪৯৬টি। বাকি প্রায় ২ লাখ ৯৮ হাজার অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের দুর্ভোগ

দারাজের হাব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। ই-ক্যাবের এক নেতা বলেন, বড় প্রতিষ্ঠানের হাব সংকুচিত হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে প্রান্তিক বিক্রেতাদের ওপর।

দারাজের এক ফ্যাশন মার্চেন্ট জানান, স্থানীয় হাব বন্ধ হওয়ায় পণ্য পাঠাতে সময় ও ব্যয় দুটোই বেড়েছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সংকটের মধ্যেও সম্ভাবনা

প্রকৌশলী আব্দুল আজিজের মতে, বাংলাদেশের ই-কমার্স এখন শুধু অনলাইন কেনাকাটার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পাঁচ লাখেরও বেশি এসএমই, ফ্রিল্যান্সার এবং নারী উদ্যোক্তার কর্মসংস্থানের অন্যতম ভিত্তি। দেশে ১৩ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং ডিজিটাল পেমেন্টের বিস্তারের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে এ খাতে ১.৫ ট্রিলিয়ন টাকার বেশি অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ভোক্তা অধিকার বিশ্লেষক ও ক্যাবের সহ-সভাপতি নাজের হোসাইন বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন সম্প্রসারণের চেয়ে টেকসই ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তোলার দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের মতে, ই-কমার্স খাতের বর্তমান সংকট কাটাতে নীতিগত সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ, অনলাইন লেনদেনে কার্যকর তদারকি এবং লজিস্টিক ব্যয় কমাতে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad