বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিডনি রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক রোগীর তেমন কোনো উপসর্গ থাকে না। ফলে শুধু উপসর্গের ভিত্তিতে রোগ শনাক্ত করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে হৃদরোগে আক্রান্ত কিংবা উচ্চঝুঁকির রোগীদের নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা করা জরুরি।
দুটি পরীক্ষায় কিডনির অবস্থা নির্ণয়কিডনির কার্যকারিতা ও ক্ষতির মাত্রা নির্ণয়ে প্রধানত দুটি পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো আনুমানিক গ্লোমেরুলার পরিস্রাবণ হার (ইজিএফআর), যা কিডনি কতটা কার্যকরভাবে রক্ত পরিশোধন করছে, সে সম্পর্কে ধারণা দেয়। অন্যটি হলো প্রস্রাবের অ্যালবুমিন-ক্রিয়েটিনিন অনুপাত (ইউএকর)। প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের উপস্থিতি কিডনি ক্ষতির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ এবং একই সঙ্গে হৃদরোগের ঝুঁকিরও একটি সূচক।
কিডনি রোগের তীব্রতা নির্ধারণে ইজিএফআর ও ইউএকর—দুটি পরীক্ষাকেই বিবেচনায় নিতে হয়। এর সঙ্গে রোগীর বয়স, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, পূর্ববর্তী হৃদরোগ এবং অন্যান্য ঝুঁকিকারকও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
কিডনি রোগ অগ্রসর হলে, প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের মাত্রা বেশি থাকলে, কিডনির কার্যকারিতা দ্রুত কমতে থাকলে কিংবা ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতার মতো জটিলতা দেখা দিলে নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে কিডনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে।
ঝুঁকি কমাতে জীবনযাপনে পরিবর্তনকিডনি রোগ শনাক্ত করাই চিকিৎসার শেষ ধাপ নয়। রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, কোলেস্টেরল কমানো, ধূমপান বন্ধ, ওজন নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম—সবই হৃদযন্ত্র ও কিডনি সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।
উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করলে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমার পাশাপাশি কিডনি রোগের অগ্রগতিও ধীর হতে পারে। একইভাবে ডায়াবেটিসের আধুনিক কিছু ওষুধ রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি হৃদযন্ত্র ও কিডনিকে অতিরিক্ত সুরক্ষা দিতে পারে।
কিডনি রোগে বাড়ে হৃদরোগের ঝুঁকিদীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগকে ধারাবাহিক হৃদযন্ত্র ও কিডনি-ঝুঁকির একটি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কিডনির কার্যক্ষমতা যত কমে এবং প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের পরিমাণ যত বাড়ে, সাধারণত হৃদরোগ ও মৃত্যুর ঝুঁকিও তত বাড়ে।
উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, ধূমপান, রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস—হৃদরোগ ও কিডনি রোগের বেশ কিছু অভিন্ন ঝুঁকিকারক। এসব নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একই সঙ্গে দুই অঙ্গের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
চিকিৎসায় প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতাকিডনি রোগ থাকলে হৃদরোগ নির্ণয়, চিকিৎসা, ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ, পর্যবেক্ষণ এবং রোগের ভবিষ্যৎ পরিণতি—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। কিডনি রোগের সঙ্গে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী করোনারি সিনড্রোম, হৃদযন্ত্রের দুর্বলতা, অলিন্দের অনিয়মিত স্পন্দনসহ বিভিন্ন হৃদছন্দের অস্বাভাবিকতা, স্ট্রোক, অন্যান্য মস্তিষ্কের রক্তনালির রোগ, প্রান্তীয় ধমনির রোগ এবং আকস্মিক হৃদযন্ত্রজনিত মৃত্যুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
করোনারি ধমনির রোগে কিডনি রোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিকারক। কিডনি রোগ থাকলে হার্ট অ্যাটাকসহ বিভিন্ন হৃদরোগের ঘটনা এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়।
চিকিৎসার সময় রোগীর কিডনির কার্যক্ষমতা অনুযায়ী ওষুধ নির্বাচন ও মাত্রা নির্ধারণ করতে হয়। একই সঙ্গে রক্তপাতের ঝুঁকি, রক্ত জমাট প্রতিরোধকারী ওষুধের ব্যবহার এবং বিভিন্ন পরীক্ষা বা চিকিৎসামূলক হস্তক্ষেপের ফলে তীব্র কিডনি ক্ষতির সম্ভাবনাও বিবেচনায় নিতে হয়। কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে হৃদরোগের উপসর্গও কখনো প্রচলিত ধরন থেকে ভিন্ন হতে পারে।
স্ট্রোকের ঝুঁকিও বেশিকিডনি রোগীদের স্ট্রোকের ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধমনিতে চর্বি ও ক্যালসিয়াম জমা এবং অন্যান্য রক্তনালিজনিত সমস্যা এ ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।
তাই স্ট্রোক প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও কিডনি রোগকে রোগীর সামগ্রিক রক্তনালিজনিত ঝুঁকি মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
লেখক: অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ
বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি
সাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ, গুলশান, ঢাকা

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক