লাল শাপলার টানে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত।
জনি হোসেন কাব্য

‘বাহ্, কী দারুণ লাল!’

বৃষ্টি সবে থেমেছে। বাড়ির পেছনের পুকুরটির দিকে গোল গোল চোখে তাকিয়ে রইল ছোট্ট ঋতু। বয়স মাত্র সাত বছর। পুকুরের পানি কালচে, চারদিকে শ্যাওলা। একটু দূরে ফুটে আছে চমৎকার একটি লাল শাপলা। দূর থেকে মনে হচ্ছে, পানির ওপর যেন একটি লাল তারা মিটমিট করে হাসছে।

ঋতুর মনে হলো, আরেকটু সামনে গেলেই ফুলটি টুক করে ছিঁড়ে নেওয়া যাবে। শাপলাটি সে পড়ার টেবিলে রাখবে। তাতে তার ঘরটির চেহারাই বদলে যাবে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল সে। নাহ্, আশপাশে বড়দের কেউ নেই।

ব্যস! গুটিগুটি পায়ে পুকুরের দিকে এগিয়ে গেল ঋতু।

টানা বর্ষায় পুকুরপাড়ের মাটি সাবানের মতো পিচ্ছিল হয়ে আছে। শাপলাটি ধরতে ঋতু হাত বাড়াতেই হঠাৎ তার পা পিছলে গেল।

‘আ...আ...!’

চিৎকার শেষ হওয়ার আগেই ধপাস করে পুকুরে পড়ে গেল সে।

সর্বনাশ! ঋতু তো সাঁতারই জানে না। পুকুরের ধারে ছিল একগাদা কচুরিপানা আর একটি সরু ডাল। ঋতু খপ করে ডালটি আঁকড়ে ধরল। কিন্তু তার ভার নিতে না পেরে ডালটি মড়মড় করে ভাঙতে শুরু করল।

এখন কী হবে?

উঠোনের এক পাশে খেলছিল জিতু। ঋতুর বড় ভাই। বয়স ১১ বছর। হঠাৎ শব্দ শুনে সে দৌড়ে পুকুরের কাছে এসে তাকিয়ে দেখল—পানির ওপর ভাঙা একটি ডাল ধরে ঝুলছে ঋতু। ডালটি যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে যেতে পারে।

জিতুর বুক ধড়ফড় করতে লাগল। বোনকে বাঁচাতেই হবে।

সে এক ঝটকায় স্যান্ডেল খুলে বলল, ‘দাঁড়া ঋতু, আমি আসছি।’

জিতু পানিতে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু শরীর সামনের দিকে ঝুঁকতেই তার মনে হলো—সে নিজেও তো সাঁতার জানে না! পানিতে নামলে সেও ডুবে যেতে পারে। তখন দুজনকেই বাঁচানোর মতো কেউ থাকবে না।

না, পানিতে ঝাঁপ দেওয়া যাবে না।

জিতু দ্রুত একটি লম্বা বাঁশের কঞ্চি নিয়ে ঋতুর দিকে বাড়িয়ে দিল। কিন্তু কঞ্চিটিও ঋতুর নাগালের বাইরে।

উঠোনে পড়ে থাকা পাঁচ লিটারের একটি খালি প্লাস্টিকের বোতল চোখে পড়ল জিতুর। সে দ্রুত বোতলটি এনে ঋতুর দিকে ছুড়ে দিল। কিন্তু ভয়ে কাঁপতে থাকা ঋতু বোতলটি ধরতে পারল না।

এবার জিতু গলার সব জোর দিয়ে চিৎকার করে উঠল—

‘বাঁচাও! বাঁচাও! চাচ্চু, বাবা, জলদি এসো! ঋতু পুকুরে পড়ে গেছে!’

জিতুর চিৎকারে বাড়ির সবাই ছুটে এলেন। বাড়ির ভেতর থেকে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে এলেন চাচ্চু। তিনি পরিস্থিতি বুঝতে না বুঝতেই দেখলেন, ডালটি ভেঙে গেছে এবং ঋতু পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে।

এক মুহূর্তও দেরি করলেন না তিনি। ঝপাস করে পুকুরে ঝাঁপ দিলেন।

চাচ্চু খুব ভালো সাঁতারু। দ্রুত সাঁতরে মুহূর্তের মধ্যেই তিনি ঋতুর কাছে পৌঁছে গেলেন। তার ফ্রকের কলার শক্ত করে ধরে ঋতুকে টেনে পাড়ে নিয়ে এলেন।

একটুর জন্য রক্ষা!

ঋতু তখনো কাশছিল এবং হাঁপাচ্ছিল। চাচ্চু তাকে এক পাশে কাত করে শুইয়ে দিলেন, যাতে তার শ্বাস নিতে সুবিধা হয়। পিঠে হাত বুলিয়ে শান্ত করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এল ঋতু।

তার ভয় কাটানোর জন্য চাচ্চু আবার পুকুরে নামলেন। এবার তিনি ছিঁড়ে আনলেন সেই লাল শাপলাটি। ফুলটি ঋতুর হাতে তুলে দিলেন।

ঋতু তো মহাখুশি! কিন্তু ফুলটি হাতে নিতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। শাপলার কাদামাখা ডাঁটায় একটি পিচ্ছিল শামুক আটকে আছে।

‘ও মা গো!’

ভয়ে লাফ দিয়ে উঠল ঋতু। তার হাত থেকে ফুলটি পড়ে গেল মাটিতে।

ঋতুর কাণ্ড দেখে সবার মুখে হাসি ফুটে উঠল।

এরই মধ্যে খবর পেয়ে ছুটে এলেন ঋতুর বাবা-মা। মা ঋতুকে জড়িয়ে ধরলেন বুকে। চাচ্চু পুরো ঘটনাটি খুলে বললেন।

সব শুনে বাবা জিতুকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘বড় বিপদ থেকে তুমি তোমার বোনকে বাঁচিয়েছ। তুমি সাঁতার জানো না বলে পানিতে ঝাঁপ দাওনি। হাতের কাছে থাকা জিনিস দিয়ে তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছ। শেষে জোরে চিৎকার করে সবাইকে ডেকেছ। তুমি একদম সঠিক কাজ করেছ।’

চাচ্চু তখন শার্টের পানি ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন, ‘তবে সাঁতার না জানাটা বড্ড বিপজ্জনক। আগামী সপ্তাহ থেকেই আমি তোমাদের সাঁতার শেখাব। ঋতু আর জিতু—দুজনেই শিখবে। আর আজই এই পুকুরের চারপাশে শক্ত বাঁশের বেড়া দিতে হবে।’

চাচ্চুর কথামতোই কাজ হলো। পুকুরের চারপাশে দেওয়া হলো শক্ত বাঁশের বেড়া।

পরের সপ্তাহে চাচ্চু ঋতু ও জিতুকে গ্রামের একটি নিরাপদ পুকুরে নিয়ে গেলেন। পুকুরটি খুব বেশি গভীর নয়। সেখানেই শুরু হলো তাদের সাঁতার শেখা।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দুজন সাঁতার শিখে গেল। ধীরে ধীরে তারা ভালো সাঁতারুও হয়ে উঠল।

একদিন বাঁশের বেড়ার পাশে দাঁড়িয়ে জিতু চোখ টিপে ঋতুকে বলল, ‘কী রে ঋতু? তুই তো এখন সাঁতার পারিস। ওই যে দেখ, একটা লাল শাপলা ফুটে আছে। আনবি নাকি?’

ঋতু খিলখিল করে হেসে মাথা নাড়ল।

‘নাহ্! শাপলায় শামুক থাকে। ফুলদানির চেয়ে পুকুরেই শাপলা বেশি সুন্দর দেখায়।’

জিতু হেসে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘একদম ঠিক বলেছিস।’

সেদিন থেকে লাল শাপলা দেখলেই ঋতুর মনে পড়ে যায় সেই দিনের কথা—যেদিন একটি ফুলের টানে গিয়ে সে বড় বিপদে পড়েছিল, আর ভাই জিতুর বুদ্ধি ও সাহস তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করেছিল।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad