রূপপুরে বিদ্যুৎ উৎপাদন পিছিয়ে যাচ্ছে যে কারণে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত।
এ বছরের সেপ্টেম্বরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু নিয়ে এখন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এমনকি চলতি বছরেই জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের বিদ্যুৎ যুক্ত হবে কি না, তা নিয়েও নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের পর পরীক্ষামূলক উৎপাদনের আগে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি কারিগরি পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হচ্ছে। এর মধ্যে পারমাণবিক চুল্লির পাইলট-অপারেটেড রিলিফ ভালভ (পিওআরভি)-সংক্রান্ত জটিলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ইউনিটের দুটি সেফটি ভালভ পরীক্ষায় প্রত্যাশিতভাবে কাজ করছে না। ফলে পরবর্তী ধাপের পরীক্ষা শুরু করা যাচ্ছে না।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, রূপপুরে ভালভের এ ধরনের জটিলতা অপ্রত্যাশিত ছিল। সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ও রাশিয়ার সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। রোসাটমের প্রধান ডিজাইনারও এ বিষয়ে কাজ করতে রূপপুরে এসেছেন।

মন্ত্রী জানান, ভালভ খুলে মেরামতের পর পুনরায় স্থাপন করা হলেও পরীক্ষায় সেটি প্রত্যাশিতভাবে কাজ করছে না। প্রায় ২৮০ থেকে ৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি চাপ তৈরি হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভালভ খোলার কথা থাকলেও পরীক্ষায় সেটি হচ্ছে না।

কেন গুরুত্বপূর্ণ সেফটি ভালভ

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সেফটি রিলিফ ভালভ চুল্লির প্রাথমিক শীতলীকরণ ব্যবস্থাকে অতিরিক্ত চাপ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চুল্লির ভেতরে চাপ নিরাপদ সীমার ওপরে উঠলে ভালভ স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে উচ্চচাপের বাষ্প নির্দিষ্ট রিলিফ ট্যাংকে ছেড়ে দেয়। চাপ নিরাপদ মাত্রায় নেমে এলে ভালভ আবার বন্ধ হয়ে যায়।

পরমাণু বিজ্ঞানী ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, রিয়্যাক্টরের তাপমাত্রা ও চাপ নিয়ন্ত্রণে সেফটি ভালভ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কারণে এটি যথাযথভাবে কাজ না করলে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তাঁর মতে, রূপপুরে ব্যবহৃত ভিভিআর-১২০০ নকশায় একাধিক স্বতন্ত্র সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফলে একটি ভালভে সমস্যা দেখা দিলে অন্যগুলো অতিরিক্ত সুরক্ষা দিতে পারে। তবে সব সুরক্ষা ব্যবস্থা নির্ধারিত মান অনুযায়ী কাজ করছে কি না, তা নিশ্চিত না করে পরবর্তী ধাপে যাওয়া সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেফটি ভালভের মাধ্যমে চাপ ও তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় রাখা হয়। অতিরিক্ত চাপ বা বাষ্প তৈরি হলে সেটি নিয়ন্ত্রণের জন্য ভালভ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে। এ ব্যবস্থা পরীক্ষায় সফল না হলে কমিশনিংয়ের পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সুযোগ নেই।

সমাধানে কত সময় লাগবে

বিদ্যমান ভালভ মেরামত করে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব না হলে নতুন ভালভ তৈরি করে আনতে হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের যন্ত্র সাধারণ বাজার থেকে কিনে আনার সুযোগ নেই; নির্দিষ্ট নকশা ও মান অনুযায়ী তৈরি করতে হয়। ফলে নতুন যন্ত্র প্রয়োজন হলে সময় আরও বাড়তে পারে।

ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, সমস্যাটি সমাধান না হওয়া পর্যন্ত রূপপুরের কমিশনিং প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তবে ঠিক কত দিনে সমাধান হবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।

কারণ জ্বালানি লোডিংয়ের পর রূপপুরে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বাকি রয়েছে। প্রতিটি ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পরই পরবর্তী ধাপে যেতে হবে।

লাইসেন্স দেবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা

পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বিএইআরএ) অনুমোদন প্রয়োজন। সব পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের ফল পর্যালোচনা করে সংস্থাটি লাইসেন্স দেবে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কোথায় কী সমস্যা হচ্ছে এবং কীভাবে তা সমাধান করা হচ্ছে—এসব যাচাই করেই পরবর্তী অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর ক্ষেত্রে তাড়াহুড়োর সুযোগ নেই। জ্বালানি লোডিংয়ের পর ক্রিটিক্যালিটি টেস্টসহ শত শত জটিল পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হয়। জেনারেটর, টারবাইন ও জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সমন্বয় করেও বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করতে হয়।

ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সব পরীক্ষা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের তারিখ বলা ঠিক হবে না। কোনো একটি পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়লে সেটি সমাধানের পর আবার পরীক্ষা করতে হয়।

রোসাটমের দায়িত্ব নিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্য

রূপপুর প্রকল্পে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের কারিগরি সহায়তা রয়েছে। সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব নিয়েও মন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

ফকির মাহবুব আনাম বলেন, রোসাটমের সঙ্গে মূল চুক্তির লক্ষ্যই হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া। প্রয়োজন হলে যন্ত্রাংশ মেরামত বা পরিবর্তন—যে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, তা রোসাটমকেই করতে হবে।

তবে চলতি বছরে ঠিক কবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে রাজি হননি মন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তাই তাড়াহুড়া করে কেন্দ্র চালুর কোনো সুযোগ নেই।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে আরও সময়

রূপপুরের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের পর ইতোমধ্যে ৯০টির বেশি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সামনে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি লোডিংয়ের পর ধাপে ধাপে পরীক্ষা চালিয়ে জাতীয় গ্রিডে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে প্রায় ১০ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ফলে সেপ্টেম্বরে পরীক্ষামূলক উৎপাদনের যে প্রত্যাশা ছিল, তা বাস্তবায়ন নাও হতে পারে।

রূপপুরে রাশিয়ার ঋণ ও কারিগরি সহায়তায় ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিটের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রাথমিক চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম ইউনিট থেকে ২০২৩ সালে উৎপাদন শুরুর কথা ছিল। তবে করোনা মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে যায়।

এদিকে প্রকল্পের অগ্রগতি ও কারিগরি জটিলতা নিয়ে নিয়মিত তথ্য প্রকাশের জন্য একটি নির্দিষ্ট মুখপাত্র বা মিডিয়া সেল থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, প্রকল্পের কাজ যত বিলম্বিত হচ্ছে, জনমনে ততই উদ্বেগ ও প্রশ্ন বাড়ছে। নিয়মিত তথ্য প্রকাশ হলে এ বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জনআস্থা বাড়ত।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad