গুগলের এআই সার্চে কমছে ওয়েবসাইটের ট্রাফিক, ঝুঁকিতে অনলাইন প্রকাশনা

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৮ বিকাল
  • ৪১০৯ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
এআই-নির্ভর সার্চে সরাসরি উত্তর পাওয়ায় কমছে ওয়েবসাইটে ক্লিক; প্রশ্ন উঠছে সংবাদমাধ্যমের ভবিষ্যৎ আয় ও ওপেন ওয়েব নিয়ে

ইন্টারনেটে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবস্থা ছিল—প্রকাশকেরা তাদের কনটেন্ট সার্চ ইঞ্জিনকে ক্রল ও ইনডেক্স করার সুযোগ দেবে, আর সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহারকারীকে সেই কনটেন্টের মূল ওয়েবসাইটে পাঠাবে। বিজ্ঞাপন, সাবস্ক্রিপশন ও পাঠকের সরাসরি সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন অনলাইন প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসা পরিচালনা করত। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর সার্চের বিস্তারে সেই ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ডেইলি সাবাহতে প্রকাশিত সালিহ কায়ার একটি মতামতধর্মী নিবন্ধে বলা হয়েছে, গুগলের এআই ওভারভিউ ও নতুন এআই মোড সার্চ ফলাফলের মধ্যেই ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর ও সারাংশ দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে যাওয়ার প্রয়োজন কমে যাচ্ছে।

গুগলের এআই ওভারভিউ ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর ওয়েবসাইটে প্রবেশের আগেই সারাংশ আকারে দেখায়। আর এআই মোড আরও এক ধাপ এগিয়ে কথোপকথনভিত্তিক অনুসন্ধান, বিভিন্ন উৎসের তথ্য সমন্বয় এবং এক প্ল্যাটফর্মে নানা কাজ করার সুযোগ তৈরি করছে। ফলে সার্চ ইঞ্জিন শুধু ওয়েবসাইটে যাওয়ার পথ দেখানোর পরিবর্তে নিজেই তথ্য পাওয়ার প্রধান গন্তব্যে পরিণত হওয়ার পথে রয়েছে।

কমছে সার্চ থেকে আসা ট্রাফিক

এআই-নির্ভর সার্চের প্রভাব ইতোমধ্যে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে। চার্টবিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ আগের বছরের তুলনায় বিভিন্ন সংবাদ ওয়েবসাইটে গুগল সার্চ থেকে আসা ট্রাফিক প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশকদের ক্ষেত্রে এই পতন ছিল প্রায় ৩৮ শতাংশ।

স্পার্কটোরোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে গুগলের প্রায় ৬৮ শতাংশ সার্চ এমন পর্যায়ে শেষ হচ্ছে, যেখানে ব্যবহারকারী কোনো বাইরের ওয়েবসাইটে ক্লিক করছেন না। ২০১৯ সালে এ হার ছিল ৪৯ শতাংশ।

এ ধরনের সার্চকে ‘জিরো-ক্লিক সার্চ’ বলা হয়। অর্থাৎ ব্যবহারকারী সার্চ করেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সার্চ পেজেই পেয়ে যান। ফলে তথ্যের মূল উৎস ওয়েবসাইটে যাওয়ার প্রয়োজন থাকে না।

যুক্তরাষ্ট্রে গুগল সার্চ নিয়ে ইউসিএলের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সার্চ কোনো পাবলিক ওয়েবসাইটে ক্লিক ছাড়াই শেষ হচ্ছে।

বেশি ঝুঁকিতে ছোট প্রকাশনা

সার্চ থেকে আসা ক্লিক কমে যাওয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে সার্চনির্ভর সংবাদমাধ্যম ও ওয়েবসাইটগুলোর ওপর। ডেইলি সাবাহর নিবন্ধে সিয়ার ইন্টার‌্যাক্টিভের গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এআই ওভারভিউ ব্যাপকভাবে চালুর পর অর্গানিক ও পেইড—উভয় ধরনের ক্লিক-থ্রু রেট উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এমনকি এআই-উত্তরে কোনো ওয়েবসাইটের লিংক থাকলেও সেখানে ক্লিকের হার কম।

বড় সংবাদ ব্র্যান্ডগুলোর নিজস্ব পাঠক, সাবস্ক্রাইবার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক অনুসারী থাকায় তারা তুলনামূলকভাবে এ ধাক্কা সামাল দিতে পারে। কিন্তু স্থানীয় ভাষার সংবাদমাধ্যম, বিশেষায়িত ওয়েবসাইট ও নতুন প্রকাশনাগুলোর বড় অংশ নতুন পাঠক পাওয়ার জন্য সার্চ ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরশীল।

সার্চে দৃশ্যমানতা কমে গেলে এসব প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন আয়, সাবস্ক্রিপশন এবং নতুন পাঠক তৈরির সুযোগও কমতে পারে। এর ফলে সংবাদমাধ্যমের বহুত্ববাদ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

কনটেন্ট নেয় এআই, পাঠক থাকে প্ল্যাটফর্মে

এখানেই গুগল ও প্রকাশকদের মধ্যে মূল দ্বন্দ্ব। গুগলের এআই মডেলগুলো উত্তর তৈরিতে ওয়েবে প্রকাশিত বিপুল পরিমাণ তথ্য ব্যবহার করে। কিন্তু সেই তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি উত্তর যদি সরাসরি গুগলের প্ল্যাটফর্মেই পাওয়া যায়, তাহলে মূল কনটেন্ট তৈরি করা প্রকাশক পাঠক হারাতে পারেন।

অর্থাৎ ওয়েবসাইটের কনটেন্ট ব্যবহার করে এআই আরও কার্যকর উত্তর তৈরি করছে; আবার সেই উত্তরই ব্যবহারকারীকে মূল ওয়েবসাইটে যাওয়ার প্রয়োজন থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। অনেক প্রকাশক এটিকে ‘ট্রাফিকের কাঠামোগত সংকট’ হিসেবে দেখছেন।

তবে গুগল এই অভিযোগ পুরোপুরি স্বীকার করেনি। কোম্পানিটির দাবি, এআই ওভারভিউ ও এআই মোডে ওয়েবসাইটের লিংক আরও দৃশ্যমান করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০২৬ সালে গুগল ইনলাইন লিংক, ওয়েবসাইট প্রিভিউ এবং ‘প্রেফার্ড সোর্সেস’ সুবিধা চালু করেছে। ব্যবহারকারীরা নিজেদের পছন্দের সংবাদমাধ্যমকে প্রেফার্ড সোর্স হিসেবে নির্ধারণ করতে পারবেন।

গুগলের হিসাবে, এআই ওভারভিউয়ের মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারী ২৫০ কোটির বেশি এবং এআই মোডের মাসিক ব্যবহারকারী ১০০ কোটির বেশি।

প্রকাশকদের জন্য নতুন নিয়ন্ত্রণ

গুগলের উদ্যোগে প্রকাশকদের জন্য নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও এসেছে। ৩১ আগস্ট থেকে বিশ্বজুড়ে প্রকাশকেরা চাইলে এআই ওভারভিউ ও এআই মোডে নিজেদের কনটেন্ট ব্যবহার বন্ধ করতে পারবেন।

তবে এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। কোনো প্রকাশক এআই সার্চ থেকে নিজেদের কনটেন্ট প্রত্যাহার করলে ওই সাইট এআই ফিচার থেকে ট্রাফিক বা ইমপ্রেশনও পাবে না। গুগল জানিয়েছে, এ সিদ্ধান্ত সাধারণ গুগল সার্চের র‌্যাংকিংয়ে প্রভাব ফেলবে না।

এদিকে বিষয়টি এখন প্রযুক্তি কোম্পানি ও প্রকাশকদের মধ্যকার বিরোধের বাইরে গিয়ে প্রতিযোগিতা নীতি ও ডিজিটাল অর্থনীতির প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশন গুগলের এআই সার্চে প্রকাশকদের কনটেন্ট ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে। প্রকাশকদের নিজেদের কনটেন্ট এআই সার্চে ব্যবহারের অনুমতি বন্ধ করার সুযোগ যথেষ্ট কি না, তা নিয়েও ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রকেরা জানতে চাইছেন।

বদলে যাচ্ছে গুগলের ব্যবসায়িক মডেল

গুগল ধীরে ধীরে এমন একটি ‘এজেন্ট ম্যানেজার’ ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে সার্চ ইঞ্জিন শুধু ব্যবহারকারীকে তথ্যের উৎসের কাছে পাঠাবে না; বরং নিজেই তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, উত্তর তৈরি এবং বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করবে।

এর ফলে ব্যবহারকারী গুগলের প্ল্যাটফর্মে বেশি সময় কাটাতে পারেন এবং বাইরের ওয়েবসাইটে যাওয়ার প্রয়োজন আরও কমতে পারে।

এ পরিবর্তনের প্রভাব শুধু সংবাদমাধ্যমের ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, স্থানীয় সংবাদ, বিশেষায়িত গবেষণা এবং দীর্ঘমেয়াদি তথ্যভিত্তিক কনটেন্ট তৈরির অর্থনৈতিক ভিত্তিও এর ফলে চাপে পড়তে পারে।

সামনে সমাধানের পথ কী

এআই সার্চের বিস্তার ঠেকাতে শুধু নিষেধাজ্ঞাই সমাধান নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রকাশক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রকদের মধ্যে কনটেন্ট ব্যবহারের ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা, কপিরাইট, লাইসেন্সিং এবং ট্রাফিক ভাগাভাগি নিয়ে নতুন কাঠামো তৈরির প্রয়োজন রয়েছে।

একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমকেও সার্চনির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি পাঠক তৈরি, সাবস্ক্রিপশন, সদস্যপদ, নিউজলেটার ও নিজস্ব ডিজিটাল কমিউনিটি গড়ে তোলার দিকে যেতে হবে।

কারণ গুগলের এআই সার্চের পরিবর্তনটি শুধু প্রযুক্তিগত নয়; এটি ইন্টারনেটের অর্থনীতি ও ক্ষমতার কাঠামোকেও প্রভাবিত করতে পারে। একসময় সার্চ ইঞ্জিন ছিল ওয়েবের দরজা। এখন সেই দরজার ভেতরেই যদি ব্যবহারকারী সম্পূর্ণ উত্তর পেয়ে যান, তাহলে দরজার ওপারে থাকা ওয়েবসাইটগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

এআই যদি ওয়েবকে আরও সমৃদ্ধ করে, তা প্রযুক্তির বড় সাফল্য হবে। কিন্তু ওয়েবের কনটেন্ট ব্যবহার করেই যদি এআই প্ল্যাটফর্মগুলো মূল ওয়েবসাইটের পাঠক ও আয় কমিয়ে দেয়, তাহলে যে উন্মুক্ত ইন্টারনেট ব্যবস্থা এআইকে বিকশিত করেছে, দীর্ঘমেয়াদে সেটিই সংকটে পড়তে পারে।

সূত্র: ডেইলি সাবাহ ও রয়টার্স




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad