অধিনায়ক জ্যোতি ক্রমশ জ্যোতিহীন, দলও তাই

  • প্রথম দর্পণ,স্পোর্টস ডেক্স
  • আপলোড সময় : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৬ দুপুর
  • ৩৫২৮ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত।
২০১৮ সালের ১০ জুন। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয় এক দিন। নারী ক্রিকেট দলের হাত ধরে সেদিন প্রথমবারের মতো কোনো মেজর শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। ভারতের বিপক্ষে এশিয়া কাপের ফাইনালে জয় এনে দিয়েছিল দেশজুড়ে আনন্দের জোয়ার। দেশের ক্রিকেটে শুরু হয়েছিল প্রত্যাশার নতুন অধ্যায়।

সেই ঐতিহাসিক সাফল্যের প্রায় আট বছর পেরিয়ে গেছে। অথচ এরপর আর কোনো বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ নারী দল। গত বৃহস্পতিবার ভারতের কাছে হেরে আরেকটি এশিয়া কাপের সেমিফাইনাল থেকেই বিদায় নিয়েছে নিগার সুলতানা জ্যোতির দল। ফলে বিশ্ব ক্রিকেট দ্রুত এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট কতটা এগিয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

পরিসংখ্যানও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। গত পাঁচ বছরে টি-টোয়েন্টিতে ৮০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে জয় ৩২টি, হার ৪৭টি এবং একটি ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়েছে। জয়ের হারকে একেবারে দৃষ্টিকটু না মনে হলেও প্রতিপক্ষের মান বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের দুর্বলতার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই ৮০ ম্যাচের ৫৫টি খেলেছে আইসিসির পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর বিপক্ষে। সেখানে জয় এসেছে মাত্র ১০টিতে। এর সাতটিই আয়ারল্যান্ড ও পাকিস্তানের বিপক্ষে। অর্থাৎ বাকি দলগুলোর বিপক্ষে ৪৩ ম্যাচে বাংলাদেশের জয় মাত্র তিনটি।

অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে গত পাঁচ বছরে ১৪টি ম্যাচ খেলেও একটিতে জিততে পারেনি বাংলাদেশ। শুধু জয় নয়, এসব ম্যাচে প্রতিপক্ষকে উল্লেখযোগ্য চাপেও ফেলতে পারেনি তারা। ভারতের বিপক্ষে ১৩ ম্যাচে বাংলাদেশের জয় একটি, হার ১২টি। একমাত্র জয়টিও এসেছে ঘরের মাঠের একটি লো-স্কোরিং ম্যাচে।

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও ব্যবধান বেড়েছে। ২০২১ সালের পর থেকে বাংলাদেশের বিপক্ষে ১১ ম্যাচ খেলে ১০টিতেই জিতেছে চামারি আতাপাত্তুর দল।

সহযোগী দেশগুলোর বিপক্ষেই সাফল্য

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে মূলত আইসিসির সহযোগী দেশগুলো। পাঁচ বছরে এসব দলের বিপক্ষে ২২টি জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। তবে তিনবার তাদের কাছেও হারের লজ্জা পেয়েছে টাইগ্রেসরা। চলতি বছর নেদারল্যান্ডস ও স্কটল্যান্ডের মতো দলের কাছেও হেরেছে বাংলাদেশ, যাদের বেশির ভাগ ক্রিকেটারই পেশাদার নন।

২০১৮ সালে ভারতকে হারিয়ে এশিয়া কাপ জেতা বাংলাদেশকে এরপর আর সেভাবে এগোতে দেখা যায়নি। এর মধ্যে ভারত গত বছর ওয়ানডে বিশ্বকাপও জিতেছে। বাংলাদেশ অবশ্য অর্জনের দিক থেকে যেন আট বছর আগের জায়গাতেই আটকে আছে।

সময়ের সঙ্গে বোলিং আক্রমণ কিছুটা শক্তিশালী হলেও ব্যাটিং ও ফিল্ডিংয়ে উন্নতির ঘাটতি স্পষ্ট। ফলে ছোট দলের বিপক্ষে কম রান রক্ষা কিংবা রান তাড়া করে জিততে পারলেও বড় দলের সামনে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ।

মানসিকতা ও ড্রেসিংরুম নিয়েও প্রশ্ন

বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত খেলোয়াড়ের পাইপলাইন না থাকা, ড্রেসিংরুমের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং সিনিয়র খেলোয়াড়দের দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হওয়া বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার অন্যতম কারণ।

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের দীর্ঘদিনের অনুসারী ও অনলাইন গণমাধ্যম বাংলানিউজের সিনিয়র প্রতিবেদক রবিউল ইসলাম রবি মনে করেন, সমস্যার মূল জায়গায় রয়েছে ক্রিকেটারদের মানসিকতা ও পরিকল্পনার ঘাটতি। তার ভাষ্য, দলের ড্রেসিংরুমের পরিবেশও অস্বস্তিকর। ক্রিকেটারদের একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে ভালো ফল করা কঠিন।

ব্যাটিং ব্যর্থতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বয়সভিত্তিক পর্যায়ে থাকা অনেক নারী ক্রিকেটারের ব্যাটিং দক্ষতায় ঘাটতি রয়েছে। সেরা ১৫ জনকে দলে নেওয়া হলেও ব্যাটিংয়ে যাদের ওপর আস্থা রাখা হচ্ছে, তারাও সেই আস্থার প্রতিদান দিতে পারছেন না।

অধিনায়কত্বে পরিবর্তনের পরামর্শ

অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতির নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রবি। তার মতে, বর্তমান টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের জন্য জ্যোতি অধিনায়ক হিসেবে উপযুক্ত নন। খেলোয়াড় হিসেবে তাকে দলে রাখার সুযোগ থাকলেও নেতৃত্বে পরিবর্তন প্রয়োজন।

তার মতে, ২০১৮ থেকে ২০২০ সালে জ্যোতি যেভাবে ক্রিকেট খেলতেন, এখনো তার অ্যাপ্রোচ অনেকটা একই রকম। অথচ এর মধ্যে বিশ্ব ক্রিকেট অনেক এগিয়ে গেছে। ফলে বর্তমান সময়ে জ্যোতির নেতৃত্ব ব্যর্থ হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

নারী ক্রিকেটে মাঠ ও মাঠের বাইরে জ্যোতির ক্ষমতা চর্চা নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ ও গুঞ্জন রয়েছে। পছন্দের খেলোয়াড়দের নিয়ে সিন্ডিকেট তৈরি, দল নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার এবং ক্রিকেটারদের মানসিকভাবে হেনস্তা করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জ্যোতির কোনো বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

দীর্ঘদিন নারী ক্রিকেট কাভার করা ক্রীড়া সাংবাদিক সাজ্জাদ খানও জ্যোতির নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার দাবি, জ্যোতির মধ্যে ক্ষমতা চর্চার প্রবণতা এখন গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি মনে করেন, জ্যোতি দলটিকে অনেকটা নিজের দল হিসেবে বিবেচনা করেন। বিভিন্ন খেলোয়াড়ের সঙ্গে তার খারাপ ব্যবহারের অভিযোগও শুনেছেন বলে জানান তিনি।

সাজ্জাদ খান আরও বলেন, জাহানারা অভিযোগ দিয়েছেন এবং মুর্শিদার সঙ্গে দেশের বাইরে একবার জ্যোতির খারাপ ব্যবহারের কথাও তিনি জেনেছেন। তার মতে, জ্যোতির সময়ে অনেক অভিজ্ঞ খেলোয়াড় দল থেকে হারিয়ে গেছেন। কেন তারা হারিয়ে গেলেন, সেই প্রশ্নও সামনে আসা প্রয়োজন।

দ্রুত পরিবর্তনের তাগিদ

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অধিনায়কত্বে পরিবর্তনের পাশাপাশি দ্রুত মানসম্পন্ন বিদেশি কোচ নিয়োগ জরুরি। খেলোয়াড়দের সঙ্গে ম্যানেজমেন্টের আলাদা করে বসে তাদের মানসিকতা ও সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করা দরকার। একই সঙ্গে শক্তিশালী পাইপলাইন তৈরিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে এখনই আরও মনোযোগ দিতে হবে।

এসব বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের অবস্থান আরও নিচে নেমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad