সরকারি চাকরির নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে বিসিএসসহ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোতে জ্ঞান অনুধাবনের পরিবর্তে মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতি, সিলেবাস শেষ করা এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এর মধ্যেই লিখিত পরীক্ষার তুলনায় ব্যক্তিনির্ভর মৌখিক মূল্যায়নের গুরুত্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
লিখিত পরীক্ষা তুলনামূলকভাবে একটি কাঠামোবদ্ধ ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন পদ্ধতি। একই প্রশ্নপত্র, নির্দিষ্ট সময় এবং নির্ধারিত নিয়মে বিপুলসংখ্যক প্রার্থী এতে অংশ নেন। উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়। ফলে প্রার্থীদের পারফরম্যান্স তুলনামূলকভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হয়।
অন্যদিকে মৌখিক পরীক্ষায় প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, যোগাযোগ দক্ষতা, উপস্থিত বুদ্ধি, আচরণ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ধারণা যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে এসব দক্ষতার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। তবে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর এমন পর্যায়ে বাড়ানো হলে, যার মাধ্যমে লিখিত পরীক্ষায় ভালো করা কোনো প্রার্থী উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে পড়তে পারেন, তখন নিয়োগপ্রক্রিয়ায় ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অনেকেই বছরের পর বছর সময় ও অর্থ ব্যয় করেন। চাকরির বয়সসীমা শেষ হওয়ার আগে অনেকে একাধিকবার পরীক্ষায় অংশ নেন। ফলে লিখিত পরীক্ষায় ভালো করার পরও যদি চূড়ান্ত ফলাফল ব্যক্তিনির্ভর মূল্যায়নের ওপর অতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে নিয়োগব্যবস্থার প্রতি প্রার্থীদের আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গ্রেড ১১ থেকে ২০ পর্যন্ত কর্মচারীরা রাষ্ট্রের সেবা কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভূমি অফিস, স্বাস্থ্যসেবা, স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেন তারা। তাই এসব পদে যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়োগপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা সুপারিশের প্রভাবের সুযোগ তৈরি হলে এর প্রভাব শুধু চাকরিপ্রার্থীর ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সরকারি সেবার নিরপেক্ষতা ও জনগণের আস্থার ওপরও পড়তে পারে।
তবে মৌখিক পরীক্ষা পুরোপুরি বাদ দেওয়ার পক্ষে নন সংশ্লিষ্টরা। কারণ লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে একজন প্রার্থীর সব ধরনের যোগ্যতা যাচাই করা সম্ভব নয়। যোগাযোগ দক্ষতা, আচরণ, দায়িত্ববোধ, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পর্কে বাস্তব ধারণা যাচাইয়ে মৌখিক পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষাকে আরও কাঠামোবদ্ধ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রার্থীর কোন কোন দক্ষতা যাচাই করা হবে, তার নির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকা, একই ধরনের মূল্যায়ন কাঠামো অনুসরণ এবং একজন প্রার্থীকে কেন নির্দিষ্ট নম্বর দেওয়া হলো—তার যৌক্তিক ভিত্তি নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া পর্যালোচনার সুযোগ রাখার কথাও বলা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি নিয়োগব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু পরীক্ষা নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রার্থীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—নিয়োগে তাদের পরিচয়, রাজনৈতিক যোগাযোগ বা সুপারিশ নয়; বরং যোগ্যতা ও মেধাই যেন প্রধান বিবেচ্য হয়।
সরকারি চাকরি কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্র নয়। একজন সরকারি কর্মচারী কোনো দলের হয়ে নয়, রাষ্ট্রের হয়ে জনগণকে সেবা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন। তাই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগত প্রভাব ও সুপারিশের সম্ভাবনা কমিয়ে মেধা, যোগ্যতা ও স্বচ্ছতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি রয়েছে।
নিয়োগব্যবস্থায় মৌখিক পরীক্ষা থাকলেও সেটির নম্বর ও মূল্যায়নপদ্ধতি এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে লিখিত পরীক্ষায় অর্জিত মেধাক্রম অস্বচ্ছ বা অনির্দিষ্ট ব্যক্তিগত বিবেচনার কারণে সহজে পরিবর্তিত হওয়ার সুযোগ না পায়। মেধাভিত্তিক ও নিরপেক্ষ নিয়োগ নিশ্চিত করতে লিখিত ও মৌখিক—উভয় পরীক্ষার মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বচ্ছ কাঠামো তৈরি করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক: মাহমিয়া আলম শান্তা, শিক্ষার্থী, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মোঃ রায়হান চৌধুরী,(নিজস্ব প্রতিবেদক)