বেলার হিসাবে, ২০০৯ সালে এসব এলাকায় টিলা ছিল ১ হাজার ২৫টি। বর্তমানে টিকে আছে ৫৬৫টি। অর্থাৎ প্রায় ৪৫ শতাংশ টিলা আর নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবশিষ্ট টিলাগুলোও রক্ষা করা না গেলে সিলেটের চিরচেনা প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য আরও দ্রুত হারিয়ে যাবে।
আবাসন ও স্থাপনায় কাটা হচ্ছে টিলাসিলেট নগরীর বালুচর, মেজরটিলা, আখালিয়া, হালদারপাড়া, খাদিমনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় একসময় ছোট-বড় অসংখ্য টিলা ছিল। এসব টিলায় ছিল গাছপালা ও সবুজের আবরণ। সময়ের সঙ্গে অনেক টিলা কেটে সমতল করা হয়েছে। সেখানে গড়ে উঠেছে আবাসিক এলাকা, বাড়িঘর ও বিভিন্ন স্থাপনা।
পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, শুধু ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিই নয়, সরকারি ও খাস জমির টিলাও বিভিন্নভাবে কাটা হচ্ছে। কোথাও পুরো টিলা নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে, আবার কোথাও টিলার একাংশ কেটে নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে।
নগরী সম্প্রসারণের সঙ্গে জমির চাহিদা বাড়ায় টিলার ওপরও চাপ বেড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় টিলা কেটে প্লট তৈরি ও বসতবাড়ি নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদনেও নগর ও আশপাশের এলাকায় আবাসন প্রকল্পের জন্য টিলা কেটে সমতল করার বিষয়টি উঠে আসে।
আদালতের নির্দেশ, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্নবেলার সিলেট সমন্বয়ক শাহ সাহেদা আক্তার বলেন, একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ১ মার্চ হাইকোর্ট টিলা কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ এবং টিলা সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে টিলার জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
তার অভিযোগ, আদালতের নির্দেশনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে টিলা কাটা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
তিনি টিকে থাকা টিলাগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি, মামলাভুক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ টিলা চিহ্নিত করে সাইনবোর্ড স্থাপন এবং নিয়মিত নজরদারির দাবি জানান। পাশাপাশি অবৈধভাবে টিলা কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান।
টিলা ধসে বাড়ছে প্রাণহানির ঝুঁকিটিলা কাটার অন্যতম বড় প্রভাব হিসেবে দেখা দিয়েছে ভূমিধসের ঝুঁকি। টিলার পাদদেশে বসতি গড়ে উঠলে বর্ষায় অতিবৃষ্টি ও মাটির ক্ষয়ের কারণে ধসের আশঙ্কা বাড়ে। সিলেটে অতীতে টিলাধসে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
বেলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত নয় বছরে সিলেটে টিলা ধসে ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিবেশকর্মীদের মতে, টিলা কেটে দুর্বল করে ফেলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি—দুই কারণেই ধসের ঝুঁকি বাড়ছে।
কোথায় কত টিলাপ্রশাসনের বিভিন্ন তথ্য ও প্রতিবেদনে সিলেট মহানগর ও সদর এলাকায় ১৯৯টি, গোয়াইনঘাটে ৪৪টি, কোম্পানীগঞ্জে একটি, বিয়ানীবাজারে ২৭০টি, গোলাপগঞ্জে ৪১৩টি এবং জৈন্তাপুরে ৯৮টি টিলার তথ্য পাওয়া যায়। কানাইঘাট ও ফেঞ্চুগঞ্জেও টিলাভূমি রয়েছে। দক্ষিণ সুরমায় কয়েকটি টিলা থাকার তথ্য থাকলেও কিছু প্রশাসনিক প্রতিবেদনে সেগুলোর সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।
প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, টিলা কাটার অভিযোগ পেলেই অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা করা হচ্ছে।
সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদসিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমান বলেন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে শুধু পরিবেশ অধিদপ্তর বা পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। টিলা কাটা বন্ধ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা টিলা সিলেটের ভূপ্রকৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। একের পর এক টিলা হারিয়ে যাওয়ায় বদলে যাচ্ছে শুধু ভূমির আকৃতি নয়, সিলেটের দীর্ঘদিনের পরিচিত প্রাকৃতিক দৃশ্যও। একবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে এসব প্রাকৃতিক সম্পদ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। তাই অবশিষ্ট টিলাগুলো সংরক্ষণ এবং আইন ও আদালতের নির্দেশনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এখন জরুরি।

প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স