একসময় বার্সেলোনার ড্রেসিংরুমে ছিলেন সবার প্রিয় ‘জোসে’। খেলোয়াড়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক, কোচ ববি রবসনের আস্থা এবং কোচিংয়ের হাতেখড়ি—সব মিলিয়ে ক্লাবটির সঙ্গে জোসে মরিনিওর সম্পর্ক ছিল বেশ ঘনিষ্ঠ। অথচ সময়ের ব্যবধানে সেই মরিনিওই হয়ে ওঠেন বার্সেলোনার অন্যতম আলোচিত প্রতিপক্ষ। রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি দুই পক্ষের সম্পর্কেও তৈরি হয় তীব্র বৈরিতা।
বার্সেলোনায় মরিনিওর উত্থান১৯৯৬ সালে ববি রবসনের সহকারী হিসেবে বার্সেলোনায় যোগ দেন মরিনিও। শুরুতে তাঁর দায়িত্ব ছিল অনুবাদ ও কোচিং সহায়তা। তবে অল্প সময়েই তিনি নিজেকে কেবল অনুবাদকের গণ্ডিতে আটকে রাখেননি। সংবাদ সম্মেলনে রবসনের বক্তব্য অনুবাদের পাশাপাশি নিজের মতামত তুলে ধরতেন। প্রয়োজনে সাংবাদিকদের সঙ্গে বিতর্কেও জড়াতেন গুরুর পক্ষে।
বার্সেলোনায় রোনালদো ও পেপ গার্দিওলার মতো খেলোয়াড়দের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। গার্দিওলার সঙ্গে কৌশল নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করতেন মরিনিও। যদিও গার্দিওলা তাঁদের সম্পর্ককে নিছক বন্ধুত্বের চেয়ে পেশাগত বোঝাপড়া হিসেবেই দেখেছেন।
রবসনের কাছ থেকে কোচিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছিলেন মরিনিও। ১৯৯৭ সালের কোপা দেল রেতে একপর্যায়ে দল পরিচালনার দায়িত্বও তাঁর হাতে তুলে দেন রবসন। বার্সেলোনাকে জিতিয়ে সেই আস্থার প্রতিদান দেন তিনি।
প্রত্যাখ্যান থেকেই কি তিক্ততার শুরু?বার্সেলোনা ছেড়ে বিভিন্ন ক্লাবে কাজ করে ধীরে ধীরে সাফল্যের শিখরে পৌঁছান মরিনিও। তবে যে ক্লাবে তাঁর কোচিংজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা, সেই বার্সেলোনায় প্রধান কোচ হিসেবে ফেরার আগ্রহও ছিল তাঁর।
২০০৮ সালে নতুন কোচ খুঁজছিল বার্সেলোনা। সে সময় ক্লাবটির দায়িত্ব নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন মরিনিও। দুই পক্ষের মধ্যে প্রাথমিক আলোচনাও হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বার্সেলোনার কোচ হিসেবে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এ সিদ্ধান্তের পেছনে তৎকালীন ক্লাব-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
এরপর ২০০৯ সালে ইন্টার মিলানের কোচ হিসেবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে বার্সেলোনাকে বিদায় করেন মরিনিও। ন্যু ক্যাম্পে সেই জয়ের পর তাঁর উদযাপনও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পুরোনো ক্লাবে ফেরার স্বপ্ন পূরণ না হওয়ার হতাশা তাঁর মধ্যে কাজ করেছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও দুই পক্ষের সম্পর্কের অবনতি তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রিয়ালের দায়িত্বে, বার্সার মুখোমুখি২০১০ সালে রিয়াল মাদ্রিদের কোচের দায়িত্ব নেন মরিনিও। তখন পেপ গার্দিওলার অধীনে বার্সেলোনা ইউরোপীয় ফুটবলে দুর্দান্ত সময় পার করছিল। সেই আধিপত্যে লাগাম টানার চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাদ্রিদে আসেন পর্তুগিজ কোচ।
এরপর মাঠে দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হয়। পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলন, রেফারিং নিয়ে মন্তব্য এবং বিভিন্ন বিতর্কে মরিনিও ও বার্সেলোনার দ্বন্দ্ব বারবার সামনে আসে। একপর্যায়ে বার্সার তৎকালীন সহকারী কোচ তিতো ভিলানোভার চোখে আঙুল দিয়ে খোঁচা দেওয়ার ঘটনাও আলোচনার কেন্দ্রে আসে।
বার্সেলোনার সঙ্গে তাঁর বিরোধের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে ওঠে নেগ্রেইরা ইস্যু। রেফারিং নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গে মরিনিওর মন্তব্যও কাতালান ক্লাবটির সঙ্গে তাঁর তিক্ত সম্পর্ককে নতুন করে আলোচনায় আনে।
পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন অধ্যায়যে ক্লাবে একসময় সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন, সেই ক্লাবের বিরুদ্ধেই পরবর্তী সময়ে মরিনিওকে দাঁড়াতে হয়েছে বারবার। বার্সেলোনার অন্দরমহলে ঘনিষ্ঠজন হিসেবে শুরু হওয়া তাঁর যাত্রা শেষ পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে ওঠে।
বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের দ্বৈরথে মরিনিওর ভূমিকা তাই শুধু একজন কোচের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠার গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পেশাগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অপূর্ণ প্রত্যাশা, মাঠের সাফল্য এবং ব্যক্তিত্বের সংঘাত।

প্রথম দর্পণ,স্পোর্টস ডেক্স