তিন দফা চিঠিতেও প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ মেলেনি, অর্থসংকটে জুলাই ফাউন্ডেশন

  • প্রথম দর্পণ,জাতীয় ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৮ দুপুর
  • ৩৫৮৯ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত
সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে একের পর এক চিঠি, একাধিক বৈঠক এবং জাতীয় সংসদে অর্থসংকটের বিষয়টি উত্থাপন—কোনোটিতেই কাটেনি জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের আর্থিক সংকট। ছয় মাস ধরে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বকেয়া রয়েছে ঈদ বোনাস, ওভারটাইম, অফিস ভাড়া ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও। দৈনন্দিন কার্যক্রম চালাতে ইতোমধ্যে ৭০ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে।

ফাউন্ডেশনের হিসাবে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ বকেয়া প্রায় ৯২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। অফিস ভাড়া, ইউটিলিটি বিল, রক্ষণাবেক্ষণ ও সরবরাহকারীদের পাওনা আরও প্রায় ৪১ লাখ টাকা। এর বাইরে জুলাই শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের প্রতিশ্রুত সহায়তা দিতে প্রয়োজন আরও ২৬৩ কোটি টাকা।

ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামাল আকবর বলেন, অর্থসহায়তার জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকও হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চেয়ে ২৯ জুলাই, ৩ আগস্ট ও ১০ আগস্ট তিন দফা চিঠি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।

ছয় মাসের বেতন-ভাতা বকেয়া

ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের মার্চ থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে ঈদ বোনাস ও ওভারটাইমের অর্থও বকেয়া রয়েছে। ছয় মাসে বেতন-ভাতাসহ মোট বকেয়া প্রায় ৯২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এর মধ্যে মূল বেতন ৭৮ লাখ, ঈদ বোনাস ৬ লাখ ৫০ হাজার এবং অন্যান্য বোনাস ৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

অফিস ভাড়া, মেইনটেন্যান্স ফি, ইউটিলিটি বিল ও বিভিন্ন পণ্য-সেবা সরবরাহকারীর পাওনা মিলিয়ে আরও প্রায় ৪১ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে অফিস ভাড়া ৩৩ লাখ, ইউটিলিটি বিল ৪ লাখ এবং ভেন্ডর পেমেন্ট দেড় লাখ টাকা।

আড়াই লাখ টাকা বকেয়া থাকায় ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার নবায়নও করা যায়নি। ফলে বিনামূল্যের বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহার করে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে ফাউন্ডেশন।

দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে ফাউন্ডেশন ৭০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে গভর্নিং বডির অনুমোদন নিয়ে মূল তহবিল থেকে ৬০ লাখ এবং সিইও কামাল আকবর ব্যক্তিগতভাবে ১০ লাখ টাকা দিয়েছেন।

শহীদ-আহতদের সহায়তায় দরকার আরও ২৬৩ কোটি

জুলাই শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের জরুরি আর্থিক সহায়তার জন্য ফাউন্ডেশনের প্রয়োজন ছিল মোট ৩৬৩ কোটি টাকা। এর বিপরীতে অন্তর্বর্তী সরকারের ত্রাণ তহবিলের ১০০ কোটি টাকাসহ বিভিন্ন উৎস থেকে ফাউন্ডেশন পেয়েছে ১২৫ কোটি টাকা।

ফাউন্ডেশনের দেওয়া হিসাবে, ৮৩১ শহীদ পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ৪২ কোটি টাকা এবং ৬ হাজার ১২৭ আহত জুলাই যোদ্ধাকে শ্রেণিভিত্তিক ৭৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে জরুরি সহায়তা দেওয়া হয়েছে ১২১ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

ফাউন্ডেশনের দাবি, অবশিষ্ট শহীদ পরিবার ও ৯ হাজার ৭৭৬ আহত জুলাই যোদ্ধাকে সহায়তা দিতে আরও ২৬৩ কোটি টাকা প্রয়োজন। এর আগে চলতি বছরের জুলাইয়েও ফাউন্ডেশনের সিইও জানিয়েছিলেন, পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় কর্মীদের বেতন এবং শহীদ-আহতদের পূর্ণাঙ্গ সহায়তা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

মন্ত্রণালয়ে একাধিক চিঠি, বাতিল ব্রিফিং

কামাল আকবরের দাবি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে গত ছয় মাসে ১৫টির বেশি চিঠি চালাচালি এবং সাত-আটবার আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ফাউন্ডেশনের বর্তমান অবস্থা ও অর্থসংকট তুলে ধরতে অন্তত তিনবার ব্রিফিংয়ের সময় নির্ধারণ করা হলেও প্রতিবারই তা বাতিল হয়েছে বলে দাবি তাঁর।

ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে গত ছয় মাসে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অন্তত চারটি আনুষ্ঠানিক চিঠি এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ে ২০ জুলাই একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চেয়ে তিন চিঠি

ফাউন্ডেশনের আর্থিক সংকট ও কার্যক্রমের বিষয় তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তিন দফা চিঠি পাঠানো হয়—২৯ জুলাই, ৩ আগস্ট ও ১০ আগস্ট। তবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হয়নি বলে দাবি করেন সিইও কামাল আকবর।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সচিবালয়ে যোগাযোগ করেও সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি। ফাউন্ডেশনের একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর স্ত্রীকে অতিথি করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটিও সফল হয়নি বলে জানান তিনি।

সংসদেও উঠেছে অর্থসংকটের বিষয়

ফাউন্ডেশনের অর্থসংকটের বিষয়টি জাতীয় সংসদেও উত্থাপিত হয়েছে। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংসদ সদস্যের মাধ্যমে বিষয়টি উত্থাপনের পরামর্শ দেন বলে জানান কামাল আকবর।

পরে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগমের মাধ্যমে বিষয়টি সংসদে উত্থাপিত হয়। সেখানে ফাউন্ডেশনকে সমাজকল্যাণ অথবা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি এবং অর্থসহায়তার দাবি জানানো হয়।

সিইওর দাবি, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও বিষয়টির সমর্থন করেছেন। সরকারদলীয় পর্যায় থেকেও প্রয়োজন মেটানোর আশ্বাস পাওয়া গিয়েছিল বলে জানান তিনি। তবে এসব আশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন এখনো দেখা যায়নি বলে তাঁর দাবি।

রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের আশঙ্কা সিইওর

অর্থসহায়তা না পাওয়ার পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনা থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কামাল আকবর। তাঁর দাবি, ফাউন্ডেশনকে এনসিপির ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করার কারণে প্রতিষ্ঠানটি সরকারের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

তবে তিনি বলেন, ফাউন্ডেশনের গঠনতন্ত্রে প্রতিষ্ঠানটিকে অরাজনৈতিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো সদস্য রাজনৈতিক দলে যোগ দিলে তাঁকে ফাউন্ডেশন থেকে অব্যাহতি নেওয়ার বিধান রয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে ফাউন্ডেশনের আর্থিক সংকট নতুন নয়। চলতি বছরের জুলাইয়েও প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কর্মীদের কয়েক মাসের বেতন বকেয়া এবং পরিচালন ব্যয়ে অর্থসংকটের কথা উঠে এসেছিল।

মন্তব্য করতে চায় না সরকার

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরও জুলাই শহীদ পরিবার ও আহতদের নিয়ে কাজ করছে। ফাউন্ডেশনের দাবি, অর্থসহায়তার জন্য এ মন্ত্রণালয়ের কাছেই বারবার যোগাযোগ করা হয়েছে।

তবে কেন ফাউন্ডেশনকে অর্থসহায়তা দেওয়া হয়নি এবং নির্ধারিত ব্রিফিংগুলো কেন বাতিল হয়েছে—এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের বক্তব্য জানতে চাইলে তাঁর তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা জানান, মন্ত্রী এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চান না।

পরে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তিনিও মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাঁর একান্ত সচিব শেখ আরিফুল ইসলাম বলেন, ফাউন্ডেশনটি একটি এনজিও; এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী কোনো মন্তব্য করবেন না।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad