নাগরিকের গোপন তথ্য সংগ্রহ-বিক্রির অভিযোগে চার পুলিশ গ্রেপ্তার

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০১ দুপুর
  • ৪৪১০ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও গোপন তথ্য অবৈধভাবে সংগ্রহ করে বিক্রির অভিযোগে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) চার কনস্টেবলকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে ভুয়া জিডি ও মামলার তথ্য দেখিয়ে বিভিন্ন মোবাইল নম্বরের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্যসহ ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ এবং পরে সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মেসেজিং প্ল্যাটফর্মে সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।

গ্রেপ্তার চারজন হলেন—ডেমরা থানার কনস্টেবল সাইমন হোসেন রাশেদ, কনস্টেবল মাসুম মিয়া, ওয়ারী থানার কনস্টেবল নিজাম উদ্দীন এবং তুরাগ থানার কনস্টেবল মো. জিহাদ মিয়া।

তাদের বিরুদ্ধে গত ২৯ সেপ্টেম্বর রমনা থানায় মামলা করেন ডিবির এসআই আবিদুর রহমান। মামলায় অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন ও দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা যুক্ত করা হয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম উত্তর বিভাগ।

বুধবার রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করে ডিবির যুগ্ম কমিশনার (সাইবার) অতিরিক্ত ডিআইজি হারুনুর রশিদ জানান, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। তদন্ত চলমান থাকায় এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিডিআর বিক্রির প্রচারণা

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১০ সেপ্টেম্বর ডিবির সাইবার মনিটরিংয়ে প্রথম বিষয়টি নজরে আসে। ফেসবুকের একটি অ্যাকাউন্ট, হোয়াটসঅ্যাপের একটি অ্যাকাউন্ট এবং টেলিগ্রামের একটি গ্রুপে বিভিন্ন মোবাইল নম্বরের সিডিআর বিক্রির প্রচারণা দেখতে পান তদন্তকারীরা। এসব তথ্যের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণের জন্য ব্যবহৃত একটি বিকাশ নম্বরেরও সন্ধান মেলে।

পরে মোবাইল অপারেটরের তথ্যের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচালিত কার্যক্রম মিলিয়ে দেখা হলে সরকারি ব্যবস্থার অপব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসে। এরপর অভিযোগের ধরন যাচাই করে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম উত্তর বিভাগ অনুসন্ধান শুরু করে।

ভুয়া জিডির নম্বর ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ

তদন্তে তুরাগ থানার একটি সরকারি ই-মেইল ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। ওই ই-মেইল থেকে ১১টি মোবাইল নম্বরের তিন মাসের সিডিআর ও এনআইডি-সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছিল। আবেদনে একটি জিডির নম্বর এবং একজন এএসআইয়ের নাম উল্লেখ করা হয়।

তবে যাচাই করে তদন্তকারীরা দেখতে পান, আবেদনে উল্লেখ করা জিডিটি তুরাগ থানার নথিতে নেই। এমনকি যে পুলিশ কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করা হয়েছিল, তিনিও ওই নম্বরগুলোর তথ্য চেয়ে কোনো আবেদন করেননি।

এজাহারে বলা হয়েছে, তুরাগ থানায় কম্পিউটার অপারেটরের দায়িত্ব পালন করা কনস্টেবল জিহাদ মিয়া সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে ওই তথ্য সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

ডেমরা থানায়ও একই কৌশলের অভিযোগ

ডেমরা থানার ক্ষেত্রেও একই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। থানার ওসির সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে চারটি মোবাইল নম্বরের সিডিআর চাওয়া হয়। ওই আবেদনে একটি মামলার নম্বর ও এক এসআইয়ের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল।

পরবর্তীতে তদন্তে দেখা যায়, আবেদনে উল্লেখ করা মামলাটি থানায় আদৌ রুজু হয়নি। সংশ্লিষ্ট এসআইও ওই নম্বরগুলোর সিডিআর চেয়ে কোনো আবেদন করেননি। এজাহারে এই তথ্য সংগ্রহের ঘটনায় কনস্টেবল সাইমন হোসেন রাশেদ ও মাসুম মিয়ার সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে তথ্য বেচাকেনার অভিযোগ

কনস্টেবল নিজাম উদ্দীনের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। এজাহার অনুযায়ী, ডেমরা থানায় কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি সিডিআর সংগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্রি করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে ওয়ারী থানায় বদলি হওয়ার পরও সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে বিভিন্ন মোবাইল নম্বরের তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

তদন্তকারীরা তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপের তথ্য পর্যালোচনা করে সিডিআর আদান-প্রদান এবং অর্থ লেনদেনের আলামত পাওয়ার কথা এজাহারে উল্লেখ করেছেন।

শুধু সিডিআর নয়, আরও গোপন তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ

ডিবির অনুসন্ধানে জানা গেছে, গ্রেপ্তার চার পুলিশ সদস্যের কয়েকজন বিভিন্ন সময়ে থানায় কম্পিউটার অপারেটরের দায়িত্ব পালন করেছেন। এ কারণে ওসিদের সরকারি ই-মেইল ব্যবহার এবং বিভিন্ন তথ্য চাওয়ার প্রক্রিয়ায় তাদের সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ ছিল।

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, অভিযোগের পরিধি শুধু কল ডিটেইল রেকর্ডে সীমাবদ্ধ নয়। মোবাইল নম্বরের কললিস্ট, সর্বশেষ অবস্থান, এনআইডি, সিমের মালিকানা এবং আইএমইআই-সংক্রান্ত তথ্যসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের সংবেদনশীল তথ্য অননুমোদিত ব্যক্তির হাতে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়, যোগাযোগের পরিধি ও চলাফেরাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে ঘটনাটি শুধু ব্যক্তিগত তথ্য বেচাকেনার অভিযোগ নয়, নাগরিকের গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

মামলাটির তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখছে ডিবি।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad