কক্সবাজারে পর্যটকদের নিরাপত্তায় ঘাটতি, অনুমোদনহীন শত শত হোটেল-রিসোর্ট

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০২ বিকাল
  • ২১৯০ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
কক্সবাজারে পর্যটকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত এক সপ্তাহে অগ্নিকাণ্ড ও সাগরে ডুবে অন্তত ১৪ জন পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় আবাসন, অগ্নিনিরাপত্তা ও সৈকতের বিনোদনব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, পর্যটননগরীতে শত শত হোটেল-রিসোর্ট পরিচালিত হলেও অধিকাংশের যথাযথ অনুমোদন ও ফায়ার লাইসেন্স নেই।

মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নারী ও শিশুসহ ১০ জনের মৃত্যুর পর পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পর্যটক, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে অপরিকল্পিত স্থাপনা, অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক তদারকির ঘাটতির বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

অনুমোদন ছাড়াই চলছে বহু রিসোর্ট

কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য রেস্তোরাঁ ও রিসোর্ট। নতুন স্থাপনাও নির্মিত হচ্ছে। জেলায় মোট হোটেল-রিসোর্টের সঠিক সংখ্যা প্রশাসনের কাছে নেই। তবে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এ সংখ্যা ৫০০ থেকে ৬০০ বা তারও বেশি।

কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খানের ভাষ্য অনুযায়ী, মেরিন ড্রাইভের আশপাশে ৪০ থেকে ৫০টি রিসোর্ট যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠেছে। তাঁদের সংগঠনের নিবন্ধিত হোটেল-রিসোর্টের সংখ্যা প্রায় ২৫০।

টুপটুপ রিসোর্টটিরও প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল না বলে জানিয়েছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক)। সংস্থাটির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন বলেন, ২০২৩ সাল থেকে রিসোর্টটি অপসারণের বিষয়ে তিন দফা নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। পরে অপসারণের নির্দেশনা দিয়ে চূড়ান্ত নোটিশও দেওয়া হয়।

জসিম উদ্দিন জানান, যেকোনো স্থাপনা নির্মাণে কউকের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু কক্সবাজারে অনেক হোটেল-রিসোর্ট প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠেছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি চলছে।

ফায়ার লাইসেন্স আছে দেড় শর মতো প্রতিষ্ঠানের

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে আনুমানিক ছয় শতাধিক হোটেল-রিসোর্টের মধ্যে মাত্র দেড় শর মতো প্রতিষ্ঠানের ফায়ার লাইসেন্স রয়েছে। প্রায় পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন সময়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজারে হোটেল-রিসোর্ট এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম জানান, আগে ১২৫টি নবায়নসহ ম্যানুয়াল লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ই-লাইসেন্সের জন্য ৫৩টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ২৩টি লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। অগ্নিকাণ্ড পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও আগুন লাগার পর দ্রুত উদ্ধার ও জীবন রক্ষার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

শফিকুল ইসলামের ভাষ্য, ফায়ার সার্ভিস নোটিশ দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করে। তবে নিজস্ব নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট না থাকায় সংস্থাটির পক্ষে এককভাবে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা বা প্রতিষ্ঠান সিলগালা করার সুযোগ সীমিত।

বাঁশ-কাঠের স্থাপনায় ঝুঁকি বেশি

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁয় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেশি। এ ধরনের স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। বহুতল হোটেল-মোটেলে জরুরি নির্গমনপথ না থাকাও বড় ঝুঁকি।

কউকের তথ্য অনুযায়ী, মাস্টারপ্ল্যানের বিধান অনুসারে সৈকতসংলগ্ন পৌর এলাকায় ৩০০ মিটার এবং এর বাইরে মেরিন ড্রাইভ এলাকায় ৫০০ মিটারের মধ্যে স্থাপনা নির্মাণে বিধিনিষেধ রয়েছে।

তবে এসব বিধিনিষেধের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। মেরিন ড্রাইভের একটি রেস্তোরাঁর দেখভালের দায়িত্বে থাকা মো. শফিউল্লাহ বলেন, এলাকায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তি উদ্যোগে হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে। সবার ক্ষেত্রে একই নিয়ম কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।

মুকিম খানও স্বীকার করেন, নিয়মনীতি না মেনে রিসোর্ট নির্মাণের কারণে ঝুঁকি বাড়ছে। তাঁর মতে, প্রশাসনের তদারকির ঘাটতি, ব্যবসায়ীদের অবহেলা ও অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা এ পরিস্থিতির পেছনে ভূমিকা রাখছে। পর্যটন খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, প্রশাসন ও ব্যবসায়ীদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

মেরিন ড্রাইভে ফায়ার স্টেশনের দাবি

টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের প্রায় ২২ কিলোমিটার দূর থেকে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হয়েছিল। ততক্ষণে পুরো রিসোর্টটি পুড়ে যায়। এ ঘটনার পর মেরিন ড্রাইভ এলাকায় ফায়ার স্টেশন স্থাপনের দাবি জোরালো হয়েছে।

পর্যটক হাবিবুর রহমান বলেন, ডলফিন মোড় থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত ফায়ার স্টেশন না থাকায় জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া কঠিন। সেখানে একটি স্টেশন থাকলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব হতে পারত বলে মনে করেন তিনি।

ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক শফিকুল ইসলামও জানান, মেরিন ড্রাইভে নতুন ফায়ার স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা, ভূমিধস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় কাছাকাছি ফায়ার স্টেশন থাকা জরুরি।

সৈকতের রাইড নিয়েও অভিযোগ

আবাসন ও অগ্নিনিরাপত্তার পাশাপাশি সৈকতের বিনোদনব্যবস্থা নিয়েও পর্যটকদের অভিযোগ রয়েছে। বিচ বাইক, ঘোড়া ও জেট স্কির মতো রাইডের নির্দিষ্ট দরদাম ও পরিচালনাস্থল না থাকায় হয়রানি এবং নিরাপত্তাঝুঁকির আশঙ্কা করছেন অনেকে।

জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে সেবার মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হোটেল-রিসোর্ট মালিকদের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হবে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে প্রশাসন অভিযান চালালেও কিছু স্থাপনা ভেঙে দেওয়ার পর আবার নির্মাণ করা হয় বলেও জানান তিনি।

পর্যটক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, কক্সবাজারের পর্যটন খাতের সুনাম ধরে রাখতে অনুমোদনহীন স্থাপনার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, জরুরি সেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সৈকতের বিনোদনব্যবস্থায় নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad