অনেকের ধারণা, শারীরিক কোনো সমস্যা না থাকলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু গর্ভাবস্থার বিভিন্ন জটিলতা প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ ছাড়াই দেখা দিতে পারে। তাই নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা মা ও শিশুর জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গর্ভকালীন চেক-আপ কেন জরুরিগর্ভকালীন নিয়মিত চেক-আপের মাধ্যমে মায়ের সার্বিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ মূল্যায়ন এবং উচ্চঝুঁকির গর্ভাবস্থা দ্রুত শনাক্ত করা যায়। একই সঙ্গে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তস্বল্পতা ও বিভিন্ন সংক্রমণ শনাক্ত করা সম্ভব হয়। নিরাপদ প্রসবের পরিকল্পনা এবং প্রসব-পরবর্তী মা ও নবজাতকের যত্ন সম্পর্কেও আগাম প্রস্তুতি নেওয়া যায়।
প্রথম চেক-আপ কখনগর্ভধারণ নিশ্চিত হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব, আদর্শভাবে গর্ভাবস্থার প্রথম ১২ সপ্তাহের মধ্যেই প্রথম চেক-আপ করা উচিত। এতে গর্ভের বয়স নির্ধারণ, সম্ভাব্য প্রসবের তারিখ হিসাব এবং প্রয়োজনীয় প্রাথমিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা যায়।
সাধারণভাবে ১ থেকে ২৮ সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতি চার সপ্তাহে একবার, ২৮ থেকে ৩৬ সপ্তাহে প্রতি দুই সপ্তাহে একবার এবং ৩৬ সপ্তাহ থেকে প্রসব পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে একবার চেক-আপের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে উচ্চঝুঁকির গর্ভাবস্থায় চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ঘন ঘন পরীক্ষা ও ফলোআপের পরামর্শ দিতে পারেন।
যেসব বিষয় পরীক্ষা করা হয়প্রতিটি চেক-আপে মায়ের রক্তচাপ, ওজন বৃদ্ধি, প্রস্রাবের অবস্থা, রক্তস্বল্পতা, রক্তে শর্করার মাত্রা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয় মূল্যায়ন করা হয়। পাশাপাশি শিশুর হৃৎস্পন্দন, জরায়ুর উচ্চতা, শিশুর অবস্থান ও নড়াচড়া এবং মায়ের হাত-পা ফুলে যাওয়ার মতো উপসর্গও দেখা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী আল্ট্রাসনোগ্রাফি করা হতে পারে।
চিকিৎসকের পরামর্শে সম্পূর্ণ রক্ত পরীক্ষা (সিবিসি), রক্তের গ্রুপ ও Rh টাইপিং, হিমোগ্লোবিন, রক্তে শর্করা, প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা, হেপাটাইটিস বি, এইচআইভি ও সিফিলিস স্ক্রিনিং এবং প্রয়োজনে থাইরয়েড পরীক্ষা করা হয়।
আল্ট্রাসনোগ্রাফির গুরুত্বগর্ভাবস্থায় আল্ট্রাসনোগ্রাফি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এর মাধ্যমে গর্ভের বয়স, শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ, জন্মগত ত্রুটির সম্ভাবনা এবং প্লাসেন্টার অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এ ছাড়া অ্যামনিয়োটিক তরলের পরিমাণ, যমজ বা একাধিক সন্তান এবং শিশুর প্রসবপূর্ব অবস্থানও নির্ণয় করা সম্ভব।
পুষ্টিতে গুরুত্বগর্ভাবস্থায় মায়ের জন্য সুষম ও পুষ্টিকর খাবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যতালিকায় দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, ডিম, মাছ, চর্বিহীন মাংস, ডাল, শাকসবজি, মৌসুমি ফল ও সম্পূর্ণ শস্যজাত খাবার রাখা উচিত। পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড, কোমল পানীয় এবং অতিরিক্ত চিনি ও লবণযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা ভালো।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলিক অ্যাসিড, আয়রন, ক্যালসিয়াম ও প্রয়োজনে ভিটামিন ডি গ্রহণ করা উচিত।
মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নগর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা বা বিষণ্ণতা দেখা দিতে পারে। এ সময়ে পরিবারের সহযোগিতা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ইতিবাচক পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
যেসব লক্ষণে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবেগর্ভাবস্থায় যোনিপথে রক্তপাত, পানি ভেঙে যাওয়া, শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়া, তীব্র পেটব্যথা, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, ঝাপসা দেখা, খিঁচুনি, উচ্চ জ্বর, শ্বাসকষ্ট, মুখ-হাত-পা হঠাৎ ফুলে যাওয়া বা বারবার বমি হলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
পরিবারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণগর্ভবতী মায়ের নিরাপত্তায় পরিবারের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া, পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা, মানসিক সমর্থন এবং জরুরি পরিস্থিতির প্রস্তুতি পরিবারের সদস্যদের নিশ্চিত করা উচিত। সম্ভাব্য প্রসবের তারিখ, নিকটস্থ হাসপাতাল, যাতায়াতের ব্যবস্থা, রক্তদাতা ও প্রয়োজনীয় অর্থের প্রস্তুতিও আগে থেকে রাখা প্রয়োজন।
সচেতনতাই নিরাপদ মাতৃত্বের ভিত্তিসময়ে জটিলতা শনাক্ত করা গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। তাই কুসংস্কার, অবহেলা বা অদক্ষ ব্যক্তির পরামর্শের ওপর নির্ভর না করে নিবন্ধিত চিকিৎসক বা দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর তত্ত্বাবধানে গর্ভকাল পার করা উচিত।
নিয়মিত গর্ভকালীন চেক-আপ শুধু একটি স্বাস্থ্যসেবা নয়; এটি মা ও অনাগত শিশুর জীবন সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপায়। সময়মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সুষম খাদ্য, প্রয়োজনীয় টিকা, মানসিক সুস্থতা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার মাধ্যমে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব। একটি সুস্থ মা-ই সুস্থ প্রজন্মের ভিত্তি। তাই গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই নিয়মিত চেক-আপকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স