একটির পর একটি অভিযোগ, তদন্ত ও শোকজের পরও যেন বদলাচ্ছে না সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রসূতি সেবার চিত্র। এবার তীব্র প্রসবব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন রাবেয়া খাতুন (২৪) নামের এক প্রসূতির মা মোছা. নার্গিস বেগম। পরিবারের দাবি, হাসপাতালে সন্তান প্রসবের পর রাবেয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে একপর্যায়ে তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এ ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রায়গঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন নার্গিস বেগম। রাবেয়া রায়গঞ্জ পৌর এলাকার ঝাপড়া মহল্লার মো. আসলামের স্ত্রী।
লিখিত অভিযোগে যা বলা হয়েছে, গত ২৭ আগস্ট রাত ৮টার দিকে প্রচণ্ড প্রসবব্যথা নিয়ে রাবেয়াকে রায়গঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সরা তাঁর যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দিয়ে হাঁটাহাঁটি করতে বলেন। এ সময় নার্সদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘এখনও প্রসবের সময় হয়নি, হাঁটাহাঁটি করলে সময় হলে আমরা দেখব।’
অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রসূতির প্রয়োজনীয় পরিচর্যা ও পর্যবেক্ষণের পরিবর্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সরা নিজেদের কক্ষে মোবাইল ফোন ব্যবহারে ব্যস্ত ছিলেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বজনদের জানানো হয়, চিকিৎসক ছুটিতে রয়েছেন এবং তিনি হাসপাতালে আসবেন না। চিকিৎসকের মোবাইল নম্বর জানতে চাওয়া হলে নার্সদের পক্ষ থেকে তাঁদের কাছে নম্বর নেই বলেও জানানো হয় বলে অভিযোগ করেছেন প্রসূতির স্বজনরা।
পরবর্তীতে প্রসবের অবস্থা বিবেচনায় রাবেয়াকে বেডে নেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে নবজাতকের অবস্থা দেখার পরও প্রসূতির সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সদের অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়। পরে তাঁকে আবারও হাঁটাহাঁটি করতে বলা হয় এবং নার্সরা নিজেদের কক্ষে চলে যান বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এরপর হাঁটাহাঁটি করার সময় হঠাৎ রাবেয়ার প্রচুর রক্তক্ষরণ ও পানি ভাঙার ঘটনা ঘটে। এতে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেঝেতে রক্ত পড়ে যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, এমন সংকটময় পরিস্থিতিতেও দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা না দিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সরা প্রসূতি ও তাঁর স্বজনদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন এবং মেঝেতে পড়ে থাকা রক্ত পরিষ্কার করে দেওয়ার জন্য বলেন।
পরে প্রসূতি মা ও নবজাতকের শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় তাঁদের সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেখানে ভর্তি হয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়ার পর বর্তমানে রাবেয়া নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে পরিবারের দাবি, প্রসবের সময় রাবেয়ার জরায়ু ও মলদ্বারের মধ্যবর্তী অংশে গুরুতর জটিলতা তৈরি হয়। সেখানে একাধিক সেলাই দিতে হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তাঁর মা নার্গিস বেগম। এ ঘটনায় রাবেয়ার শারীরিক অবস্থা ও ভবিষ্যৎ চিকিৎসা নিয়ে পরিবারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রায়গঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসূতি সেবা নিয়ে এবারই প্রথম অভিযোগ নয়। এর আগেও গত আগস্ট মাসে প্রসবব্যথা নিয়ে হাসপাতালে আসা এক নারীকে সময়মতো চিকিৎসা না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় হাসপাতালের ডেলিভারি কক্ষ বন্ধ থাকা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের উপস্থিতি না পাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছিল। পরে হাসপাতালের পরিবর্তে পথেই ওই প্রসূতির সন্তান প্রসবের ঘটনা ঘটে।
ওই ঘটনার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। পরে দায়িত্বে থাকা দুই মিডওয়াইফকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়। এর পরপরই একই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসূতি সেবা নিয়ে নতুন করে অভিযোগ ওঠায় হাসপাতালের জরুরি সেবা, দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক-নার্সদের উপস্থিতি এবং রোগীদের যথাযথ পর্যবেক্ষণ নিয়ে ফের প্রশ্ন উঠেছে।
শুধু প্রসূতি সেবাই নয়, এর আগে হাসপাতালের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, অচল সিসিটিভি ক্যামেরা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ সরকারি ওষুধ সংরক্ষণের অভিযোগ নিয়েও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
এ বিষয়ে রায়গঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প.প কর্মকর্তা আ.ফ.ম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতালের অন্য কোনো কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট নার্সদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একের পর এক অভিযোগ ওঠায় প্রশ্ন উঠেছে- প্রসূতি সেবায় জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা, দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও নার্সদের উপস্থিতি এবং রোগীদের যথাযথ পর্যবেক্ষণে কর্তৃপক্ষ কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।
সর্বশেষ অভিযোগটির সত্যতা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে আগের ঘটনায় শোকজের খবর প্রকাশের পরও একই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসূতি সেবা নিয়ে নতুন করে অভিযোগ ওঠায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

পারভেজ সরকার,স্টাফ রিপোর্টার