ঢাকার চারপাশে ৭৫০ অবৈধ ইটভাটা, দূষণে বিপর্যস্ত জনজীবন

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:২০ বিকাল
  • ৪১৯৭ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
রাজধানী ঢাকার আশপাশের কেরানীগঞ্জ, রূপগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, ধামরাই ও গাজীপুরে অন্তত ৭৫০টি অবৈধ ইটভাটা চলছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স এবং আইন নির্ধারিত দূরত্ববিধি উপেক্ষা করেই বছরের পর বছর এসব ভাটায় উৎপাদন চলছে। এমনকি ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের দেয়াল ঘেঁষেও রয়েছে পাঁচটি অবৈধ ইটভাটা।

বারবার অভিযান, আদালতের নির্দেশ এবং সরকারি সংস্থাগুলোর চিঠি চালাচালির পরও এসব ভাটা বন্ধ করা যাচ্ছে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণা অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে ঢাকার বায়ুদূষণের প্রায় ৫৮ শতাংশের জন্য ইটভাটা দায়ী।

ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের একাংশকে ‘ম্যানেজ’ করে অনেক ভাটা বছরের পর বছর চালানো হচ্ছে। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

যেখানে যত ভাটা

নারায়ণগঞ্জে ২৪১টি ইটভাটার মধ্যে বৈধ ৯৪টি; অবৈধ ১৪৭টি। বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর দুই তীরে রয়েছে শতাধিক ভাটা। রূপগঞ্জে ৭৪টি ভাটার মধ্যে ৭০টিই অবৈধ বলে জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ে অনুমোদনহীন ইটভাটার সংখ্যা ৩৫৪টি। এর মধ্যে ধামরাইয়ে ১৬৭, সাভারে ১১৭ এবং আশুলিয়ায় ৭০টি। এসব ভাটায় বছরে প্রায় সোয়া কোটি থেকে দেড় কোটি ইট উৎপাদন হয়।

কেরানীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুর, দোলেশ্বর, জাজিরা ও মোল্লাবাজার এলাকায় চলছে অর্ধশতাধিক অবৈধ ভাটা। শুধু ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের চারপাশেই রয়েছে পাঁচটি।

গাজীপুরে পরিবেশ ছাড়পত্রপ্রাপ্ত ইটভাটা রয়েছে প্রায় ১৩০টি। এর মধ্যে অভিযান চালিয়ে ১৫ থেকে ১৮টি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় বর্তমানে কোনো ইটভাটা নেই।

পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে, সারা দেশে চালু প্রায় ৭ হাজার ৮৬টি ইটভাটার মধ্যে ৪ হাজার ৫৫০টির পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। এর বড় অংশই রাজধানীর আশপাশে।

বন, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, এসব ইটভাটা নিয়ে মন্ত্রণালয় কাজ করছে। বৃহস্পতিবারও এ বিষয়ে বৈঠক হয়েছে। শিগগির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায়

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন ইটভাটার মালিকদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, মালিকদের রাজনৈতিক পরিচয় ভিন্ন হলেও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে ব্যবসা টিকিয়ে রাখেন তারা।

ভাটা-মালিকদের কয়েকজনের ভাষ্য, বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দলের লোকজনই এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তবে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে ব্যবসায়ী পরিচয়েই তারা সক্রিয়। ক্ষমতায় যে দল থাকে, সেই দলের প্রভাবশালীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলাই তাদের কৌশল।

একজন সরকারি কর্মকর্তা জানান, অবৈধ ভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল থেকে তদবির আসে। এতে অভিযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে।

অভিযান শেষে আবার উৎপাদন

স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান শুরু হলে ভাটা-মালিকরা অর্থের বিনিময়ে সংশ্লিষ্টদের ‘সামাল’ দেন। ফলে অনেক অভিযান কার্যকর ফল না দিয়েই শেষ হয়। চিমনি ভেঙে ভাটা বন্ধ করে দেওয়া হলেও কয়েক দিনের মধ্যে টিনের অস্থায়ী চিমনি তৈরি করে আবার উৎপাদন শুরু করার ঘটনাও ঘটছে।

সাভার ও আশুলিয়ায় এমন ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

ইটের প্রধান কাঁচামাল মাটিও সংগ্রহ করা হচ্ছে অনিয়ম করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের আঁধারে ফসলি জমির টপ সয়েল কেটে ভেকু দিয়ে তা ট্রাকে করে ভাটায় নেওয়া হয়। প্রতি ট্রাক মাটি ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। নদীতীরবর্তী এলাকা থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌযানে মাটি আনা হলে প্রতি বোটের দাম পড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা।

পোড়ানো হচ্ছে কাঠ ও প্লাস্টিক

আইনে ইট পোড়াতে কাঠ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে কাঠ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি খরচ কমাতে পুরোনো প্লাস্টিকজাতীয় দ্রব্য ও নষ্ট বৈদ্যুতিক তারের প্লাস্টিকও পোড়ানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্রিকস ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফিরোজ হায়দার খান বলেন, ঢাকার চারপাশে অবৈধ ইটভাটা তেমন নেই। কিছু ভাটার লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে নবায়ন হয়নি। আমিনবাজারে কিছু পুরোনো পদ্ধতির উৎপাদনকেন্দ্র রয়েছে। তাঁর মতে, তড়িঘড়ি করে এসব বন্ধ করলে বছরে প্রায় ৬ কোটি ইটের চাহিদা পূরণে সংকট তৈরি হয়ে দাম বেড়ে যেতে পারে।

আইনে নিষেধাজ্ঞা, বাস্তবে ভিন্ন চিত্র

২০১৩ সালের ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইনে আবাসিক এলাকা, সংরক্ষিত এলাকা ও সরকারি স্থাপনার এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ২০১৯ সালের সংশোধনীতে লাইসেন্স ছাড়া ভাটা পরিচালনার জন্য দুই বছরের কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান করা হয়।

স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল ও সরকারি বনভূমির এক কিলোমিটারের মধ্যেও ইটভাটা স্থাপনের সুযোগ নেই। অথচ বাস্তবে এসব স্থাপনার কাছাকাছি অসংখ্য ভাটা চলছে।

২০১৯ সালে হাই কোর্টের এক আদেশে বুড়িগঙ্গা নদীদূষণকারী কারখানা এবং রাজধানীর আশপাশের সব ইটভাটা বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে বছর পেরিয়ে গেলেও কেরানীগঞ্জের অনেক ভাটা এখনো চালু রয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ

কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা আবদুল হক বলেন, কোন্ডা ইউনিয়নে ২৫টির বেশি ইটভাটার কারণে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। এতে কৃষি উৎপাদন কমার পাশাপাশি মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

রূপগঞ্জের গোলাকান্দাইল এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ভাটার ধোঁয়ায় বাড়ির টিনের চালা দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগেও ভুগছেন স্থানীয়রা।

কর্ণগোপ এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হুদা বলেন, ভাটার ধোঁয়ায় আম, নারিকেলসহ বিভিন্ন গাছে ফলন কমে গেছে। পরিবেশ দূষণের কারণে বাড়িতে ভাড়াটিয়াও থাকতে চান না।

নারায়ণগঞ্জ প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক সাবেরা সুলতানা বলেন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি।

প্রশাসনের বক্তব্য

নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ এইচ এম রাশেদ বলেন, অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।

গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আরেফিন বাদল বলেন, ইটের প্রয়োজন রয়েছে, তবে ইটভাটার দূষণে মানুষের শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন ক্ষতি হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনেও এ দূষণের প্রভাব রয়েছে। তাই ইট উৎপাদনে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি।

কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উমর ফারুক জানান, ঢাকা জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে সমন্বিত টিম গঠন করে সব ভাটার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, পোড়া ইটের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ব্লক ইট ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান অনেক ক্ষেত্রেই সাময়িক হওয়ায় কিছুদিন পরই বন্ধ ভাটা আবার চালু হয়ে যায়।

প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সমাধান

বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন বলেন, বিচ্ছিন্ন উচ্ছেদ অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পরিবেশবান্ধব ব্লক ইটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি খাত ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশবিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক ড. মো. আবদুল খালেক বলেন, রাজধানীর চারপাশের অবৈধ ইটভাটার কারণে পরিবেশের ওপর চরম চাপ তৈরি হয়েছে। পুরোনো পদ্ধতিতে উৎপাদনের কারণে ধোঁয়া ও ধুলা ছড়িয়ে পড়ছে। ঢাকার বায়ুদূষণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ এসব ইটভাটা।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, কেরানীগঞ্জ, রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ প্রতিনিধিরা।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad