গত সপ্তাহে নেপাল-চীন নিয়ন্ত্রিত তিব্বত সীমান্তে একটি হিমবাহ ধসে ব্যাপক পানির ঢল নামে। এতে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর উপত্যকা প্লাবিত হয়। পানির সঙ্গে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোতে বহু গ্রাম, সেতু ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হয়।
টানেলে আটকা শ্রমিকদের উদ্ধারে তৎপরতাকর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর তীরে নির্মিত বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে অন্তত ৬৩৯ জন শ্রমিক এখনো নিখোঁজ। এর মধ্যে রাসুওয়াগাধি ও আপার ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পেই নিখোঁজ প্রায় ৯০ জন।
রাসুওয়াগাধি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি তিব্বত সীমান্ত থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে রাসুওয়া জেলায় অবস্থিত। বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি হওয়ায় সেখানে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। হেলিকপ্টার ছাড়া সেখানে যাতায়াত প্রায় অসম্ভব।
নেপালি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, রাসুওয়াগাধির টানেলের ভেতরে এখনো বায়ু থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে সেখানে আটকা শ্রমিকরা এক সপ্তাহের বেশি সময়ও টিকে থাকতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে।
কর্মকর্তা শাহী বলেন, টানেল দিয়ে হেঁটে প্রবেশ করা সম্ভব এমন একমাত্র প্রকল্প এটি। তিন দিন আগে সেনাবাহিনী সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করলেও আটকা পড়া কক্ষটির সন্ধান পায়নি। নতুন করে উদ্ধার অভিযান শুরু করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, আপার ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের সন্ধান পেতেই উদ্ধারকারীদের প্রায় ছয় দিন সময় লাগে। ঘন কাদা ও ধ্বংসাবশেষে টানেলের প্রবেশপথ ঢাকা পড়ে যাওয়ায় অভিযান ব্যাহত হয়।
নেপালি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত জানিয়েছেন, টানেলের ভেতরে ৩০ থেকে ৪০ জন শ্রমিক এখনো জীবিত থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। টানেলের ভেতরে একটি শুকনো জায়গার সন্ধান পাওয়া গেছে। সেটিতে পৌঁছানোর জন্য প্রবেশপথ তৈরির চেষ্টা চলছে।
সেনাবাহিনী জানিয়েছে, জীবিতদের উদ্ধারের সম্ভাবনা যতক্ষণ থাকবে, ততক্ষণ অভিযান চলবে। একই সঙ্গে নিখোঁজদের মরদেহ উদ্ধারের কাজও অব্যাহত থাকবে।
প্রাণহানি ১ হাজার ২৫২, নিখোঁজ ৪ হাজারের বেশিবিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, বন্যার পানির গতিবেগ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছেছিল। প্রায় ৯৭ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রবল স্রোত ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ২৫২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ২০০ জনের বেশি। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রাথমিক হিসাবে, বন্যায় অন্তত ২২ লাখ টন ধ্বংসাবশেষ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ভবনের ধ্বংসাবশেষ, পাথর ও বিপুল পরিমাণ পলি রয়েছে।
বন্যার পানির সঙ্গে আসা বিশাল পাথর ও কাদায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর টানেলের প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে যায়। কোথাও কোথাও টানেল গভীর কাদায় চাপা পড়ে। এসব ভূগর্ভস্থ স্থাপনাই এখন উদ্ধার অভিযানের প্রধান কেন্দ্র। এ পর্যন্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো থেকে ২৭০ জনের বেশি মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
স্বজনদের অপেক্ষা, বাড়ছে ক্ষোভনিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনেরা টানা আট দিন ধরে নেপালের বিদ্যুৎ দপ্তরে এসে স্বজনদের খবরের অপেক্ষা করছেন। ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করতে গিয়ে নিখোঁজ হন জীবানলাল অধিকারী।
তার বোন লক্ষ্মী অধিকারীর অভিযোগ, কর্তৃপক্ষ স্বজনদের পর্যাপ্ত তথ্য দিচ্ছে না এবং উদ্ধার অভিযানও যথেষ্ট দ্রুত এগোচ্ছে না। তিনি বলেন, ভাইয়ের খোঁজে এক মন্ত্রণালয় থেকে আরেক মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে। কিন্তু এখনো তারা নিশ্চিত হতে পারেননি, তাদের স্বজনেরা জীবিত আছেন কি না।
বড় ধাক্কায় নেপালের জলবিদ্যুৎ খাতগত কয়েক বছরে নেপাল জলবিদ্যুৎ খাতে ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। তবে এবারের বন্যায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
প্রাথমিক জরিপ অনুযায়ী, বন্যায় অন্তত ১১টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। এতে নেপালের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ অচল হয়ে পড়েছে।
বন্যার পর ২০ হাজারের বেশি বাড়ি পুনর্নির্মাণ করতে হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিক হিসাবে পুরো পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে ব্যয় হতে পারে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
তবে বিপুল এই ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেও এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার টানেলে আটকে থাকা শ্রমিকদের জীবিত উদ্ধার। টানেলের ভেতরে বায়ু ও শুকনো জায়গা থাকার সম্ভাবনাকে ভিত্তি করে কর্তৃপক্ষ আশা করছে, নিখোঁজদের কেউ কেউ এখনো জীবিত থাকতে পারেন।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক