তিনি বলেছেন, মহানবী (সা.) কোনো নির্দিষ্ট জাতি, ভূখণ্ড বা সময়ের জন্য প্রেরিত হননি। তিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত, নৈতিকতা, মানবিক মর্যাদা ও ঐক্যের বার্তা নিয়ে এসেছেন।
মাজার-ই-শরিফ শহরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও হজরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. হোসেইনি বলেন, মহানবী (সা.)-এর জন্মদিন শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণের দিন নয়; বরং এমন এক আলোর উদয়ের স্মরণ, যা মানুষকে অজ্ঞতা, নিপীড়ন ও অন্ধকার থেকে মুক্ত করে সঠিক পথ দেখিয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহানবীকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বার্তার মূল ভিত্তি হলো রহমত, তাওহিদ ও মানবিক মর্যাদা।
নৈতিকতাই নবীজির শিক্ষার অন্যতম ভিত্তিমহানবী (সা.)-এর চরিত্রকে তাঁর জীবনাদর্শের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে উল্লেখ করে হোসেইনি বলেন, কোরআন তাঁকে মহান চরিত্রের অধিকারী হিসেবে অভিহিত করেছে। ফলে নৈতিকতা তাঁর শিক্ষা ও দাওয়াতের কোনো গৌণ বিষয় নয়; এটি তাঁর জীবনাদর্শের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
সততা, আমানতদারি, ক্ষমাশীলতা, দয়া, ন্যায়বিচার, মানুষের প্রতি সম্মান এবং অসহায়দের প্রতি দায়িত্বশীলতার মতো গুণগুলো নবীজির (সা.) জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান মুসলিম সমাজে এসব গুণের প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
তিনি বলেন, মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা থাকলে তার প্রতিফলন মানুষের আচরণ ও সামাজিক জীবনে দেখা যেতে হবে। তাঁর জীবন সম্পর্কে জ্ঞান শুধু আলোচনা, মাহফিল কিংবা জন্মবার্ষিকী পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তা ব্যক্তিজীবন ও সামাজিক আচরণে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
বিভেদ নয়, ঐক্যের আহ্বানমুসলিম উম্মাহর ঐক্যকে মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেন হোসেইনি। তাঁর মতে, মহানবী (সা.) তাওহিদ ও ঈমানের ভিত্তিতে একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পবিত্র কোরআনও মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
তিনি বলেন, শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও তাওহিদ, পবিত্র কোরআন, মহানবী (সা.)-এর নবুয়ত ও কিবলার মতো মৌলিক বিষয়ে তাদের ঐক্য রয়েছে। এসব অভিন্ন বিষয় মুসলিম ঐক্য ও সংহতির শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে।
মতপার্থক্য যেন শত্রুতা ও বিভাজনে রূপ না নেয়, সে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মতভেদকে সংলাপ, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।
জ্ঞান ও শিক্ষায় নতুন সভ্যতামহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শে জ্ঞান ও শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে হোসেইনি বলেন, নবীজির দাওয়াতের সঙ্গে শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি ও মানবিক প্রশিক্ষণও যুক্ত ছিল। কোরআনে তাঁর দায়িত্বের মধ্যে আয়াত পাঠ, মানুষের পরিশুদ্ধি এবং কিতাব ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তাঁর মতে, মহানবী (সা.) যে সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার অন্যতম ভিত্তি ছিল জ্ঞান, শিক্ষা ও মানবিক প্রশিক্ষণ। তাই মুসলিম বিশ্বের স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও গবেষণাকেন্দ্রগুলোকে অজ্ঞতা, পশ্চাৎপদতা ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে কাজ করতে হবে।
বিশেষ করে মুসলিম তরুণদের জ্ঞান, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও নিজস্ব পরিচয়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে সমন্বয় করে তরুণ প্রজন্ম মানবিক ও উন্নত সভ্যতা নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মন্তব্য করেন।
ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদাহোসেইনি বলেন, মহানবী (সা.)-এর শিক্ষায় মানুষের মর্যাদা সম্পদ, ক্ষমতা, বংশ, জাতি বা সামাজিক অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল নয়। ঈমান, তাকওয়া ও মানবিকতাই মানুষের মর্যাদার মূল ভিত্তি।
নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াকে মুসলমানদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব উল্লেখ করে তিনি ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নিপীড়িত মানুষের দুর্ভোগের কথাও তুলে ধরেন। একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের বিবেক ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার আহ্বান জানান।
আধুনিক বিশ্বেও প্রাসঙ্গিক নবীজির আদর্শবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আধুনিক বিশ্বের ব্যাপক অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে হোসেইনি বলেন, এত উন্নতির পরও মানুষ যুদ্ধ, সহিংসতা, বৈষম্য, অবিচার, উগ্রবাদ, নৈতিক অবক্ষয় ও আধ্যাত্মিক সংকট থেকে মুক্ত হতে পারেনি।
তাই বর্তমান বিশ্বে মহানবী (সা.)-এর রহমত, নৈতিকতা, মানবিক মর্যাদা ও আধ্যাত্মিকতার বার্তা আরও বেশি প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কোরআনের ‘আল্লাহর রাসুলের মধ্যে উত্তম আদর্শ’ থাকার কথা উল্লেখ করে হোসেইনি বলেন, মহানবী (সা.)-এর জীবন শুধু ইতিহাস পাঠের বিষয় নয়। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও সাংস্কৃতিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর জীবন আজও মানুষের জন্য পথনির্দেশ হতে পারে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, মহানবী (সা.)-এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার অর্থ তাঁর পথ ও নৈতিকতা অনুসরণ করা। তাঁর জন্মবার্তার সারকথা হলো—রহমত, নৈতিকতা, ঐক্য, জ্ঞান ও ন্যায়বিচার। এসব মূল্যবোধকে শুধু অনুষ্ঠান ও বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনে ধারণ করাই মুসলমানদের দায়িত্ব।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক