সুরা কাহফ পবিত্র কোরআনের ১৮ নম্বর সুরা। এটি ১৫তম পারায় শুরু হয়েছে এবং এতে মোট ১১০টি আয়াত রয়েছে।
জুমার দিনে সুরা কাহফের ফজিলতজুমার দিন মুসলমানদের জন্য একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ দিন। এ দিনে বিভিন্ন আমলের মধ্যে সুরা কাহফ তিলাওয়াতের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহ্ফ পড়বে, তার (ঈমানের) নূর এই জুমা থেকে আগামী জুমা পর্যন্ত চমকাতে থাকবে।’ (মিশকাত)
সুরা কাহফ তিলাওয়াতের সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রশান্তি নাজিল হওয়ার ঘটনাও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। বারাআ (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি সুরা কাহফ তিলাওয়াত করছিলেন। তার পাশে দুটি রশি দিয়ে একটি ঘোড়া বাঁধা ছিল। এ সময় এক টুকরো মেঘ এসে তাকে ছায়া দেয় এবং ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসে। এতে ঘোড়াটি ভয় পেয়ে লাফাতে শুরু করে।
সকালে ওই ব্যক্তি নবী (সা.)-এর কাছে ঘটনাটি জানালে তিনি বলেন, ‘এ ছিল আস-সাকিনা (প্রশান্তি/ফেরেশতা), যা কোরআন তিলাওয়াতের কারণে নাজিল হয়েছিল।’ (বুখারি)
দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষার আমলসুরা কাহফের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত হলো দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষার সঙ্গে এর সম্পর্ক। হাদিসে সুরা কাহফের প্রথম ১০ আয়াত মুখস্থ করার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্য একটি বর্ণনায় শেষ ১০ আয়াতের কথাও এসেছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সুরা আল-কাহ্ফের প্রথম ১০টি আয়াত মুখস্থ করবে তাকে দাজ্জালের অনিষ্ট হতে নিরাপদ রাখা হবে।’ (মুসলিম)
দাজ্জালের ফিতনা হবে অত্যন্ত কঠিন। হাদিসে তার সঙ্গে এমন কিছু বিষয় থাকার কথা এসেছে, যা বাহ্যিকভাবে জান্নাত ও জাহান্নামের মতো মনে হবে। কিন্তু বাস্তবে তার বিপরীত হবে।
হুজাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) দাজ্জাল সম্পর্কে বলেছেন, ‘দাজ্জালের আবির্ভাবকালে তার সঙ্গে পানি এবং আগুন থাকবে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে যা আগুন মনে হবে, প্রকৃতপক্ষে তা হবে ঠান্ডা পানি। আর যা পানি মনে হবে, সেটি হবে মূলত দাউ দাউ করা আগুন। তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সেই সময়ের মুখোমুখি হবে, সে যেন দাজ্জালের আগুনের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে; কারণ সেটি হবে সুমিষ্ট ও শীতল পানি।’ (বুখারি ও মুসলিম)
দাজ্জালের কাছ থেকে দূরে থাকার নির্দেশদাজ্জালের আবির্ভাবের আগে ও পরে পৃথিবীতে নানা ধরনের ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে। এ অবস্থায় মুসলমানদের ঈমান ও আমল হেফাজতের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দাজ্জাল বের হওয়ার কথা শুনবে, সে যেন তার কাছে না যায়। আল্লাহর শপথ! এমন একজন লোক দাজ্জালের কাছে যাবে, যে নিজেকে ঈমানদার মনে করবে। অতঃপর সে দাজ্জালের সঙ্গে প্রেরিত সন্দেহময় জিনিসগুলো ও তার কাজকর্ম দেখে বিভ্রান্তিতে পড়ে ঈমানহারা হয়ে তার অনুসারী হয়ে যাবে।’ (আবু দাউদ)
হাদিসে আরও এসেছে, দাজ্জাল মক্কা ও মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না। তাই তার ফিতনার সময় এ দুই নগরী বিশেষ নিরাপদ থাকবে।
ঈমানের পরীক্ষায় দাজ্জালের ফিতনাদাজ্জালের ফিতনার একটি দিক হলো তার কপালে আরবি অক্ষরে ‘কাফের’ লেখা থাকবে। ঈমানদাররা তা পড়তে পারবেন, যদিও তারা নিরক্ষর হন। বিপরীতে অমুসলিম ও মুনাফিকরা তা পড়তে পারবে না।
দাজ্জালের আরেকটি বড় পরীক্ষা হবে মৃতকে জীবিত করার মতো বিষয় প্রদর্শন। হাদিসে এসেছে, সে মানুষকে বলবে—তার মৃত পিতা-মাতাকে জীবিত করে দেখাতে পারলে তাকে প্রভু হিসেবে মানতে হবে। এ সময় শয়তান তার পিতা-মাতার আকৃতি ধারণ করে তাকে দাজ্জালের অনুসরণ করতে বলবে। (ইবন মাজাহ)
এ ধরনের ভয়াবহ প্রতারণা ও পরীক্ষার মুখে দুর্বল ঈমানের মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়তে পারে। তাই ঈমানকে দৃঢ় রাখা এবং কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সুরা কাহফে ঈমানের শিক্ষাসুরা কাহফের নিয়মিত তিলাওয়াত, বিশেষ করে এর প্রথম ও শেষ ১০ আয়াত মুখস্থ করা, দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ আমল হিসেবে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। পাশাপাশি জুমার দিনে এ সুরা তিলাওয়াত করলে এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত নূরের ফজিলত লাভের কথা হাদিসে এসেছে।
তাই মুসলমানদের উচিত নিয়মিত সুরা কাহফ তিলাওয়াত করা, এর শিক্ষা অনুধাবন করা এবং ঈমানকে দৃঢ় করার চেষ্টা করা। দুনিয়ার নানা ফিতনা থেকে নিজেদের রক্ষা করার পাশাপাশি দাজ্জালের ভয়াবহ ফিতনা থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করাও মুমিনের কর্তব্য।

মোঃ রায়হান চৌধুরী,(নিজস্ব প্রতিবেদক)