চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপ, হাসপাতালে বেড সংকট

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪২ দুপুর
  • ৫১৩১ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বেড সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তি নেওয়ার সুযোগ নেই। বাধ্য হয়ে অনেকে বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। একই সঙ্গে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মশার উপদ্রব বাড়লেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাসিন্দারা।

সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, ডেঙ্গু ওয়ার্ডগুলোতে অধিকাংশ বেড রোগীতে পূর্ণ। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০৪ জনসহ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ২৩১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। নতুন রোগী ভর্তি করতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও প্রতিদিন রোগীর ভিড় বাড়ছে।

সেপ্টেম্বরে ১৩ মৃত্যু

চট্টগ্রামে চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই ডেঙ্গুতে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত শনিবার নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে মুচলেকা দিয়ে ছাড়পত্র নেওয়ার পর ফেরার পথেই মনি আক্তার নামে এক নারীর মৃত্যু হয়। তাঁর আট বছর বয়সী ছেলে আবু জাহেদও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

আবু জাহেদের বাবা আল আমিন জানান, স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর বিল দাঁড়ায় ১ লাখ ২১ হাজার টাকা। তিনি ৩০ হাজার টাকা পরিশোধ করে বাকি টাকা বকেয়া রেখে স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতাল ছাড়েন। সেদিনই তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হয়। এখন ছেলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগে রয়েছেন তিনি।

এক বছরে আক্রান্ত বেড়েছে প্রায় ৫৬ শতাংশ

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৯২২ জন। এর মধ্যে ১৫ উপজেলায় ১ হাজার ৭১১ জন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় ১ হাজার ৭৭০ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

গত বছরের প্রথম নয় মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫১৫ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আক্রান্ত বেড়েছে ১ হাজার ৪০৭ জন বা ৫৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

শুধু সেপ্টেম্বরের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন ৯৩৫ জন এবং মারা যান চারজন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৭৮৬ জন এবং মারা গেছেন ১৩ জন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আক্রান্তের সংখ্যা ৯১ দশমিক ০২ শতাংশ এবং মৃত্যু ২২৫ শতাংশ বেড়েছে।

সীতাকুণ্ডেও পরিস্থিতি নাজুক

চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলার মধ্যে সীতাকুণ্ডে ডেঙ্গু পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। গত ১৭ সেপ্টেম্বর সিরাজুল মুনিরা (৫) নামে এক শিশু এবং ২২ সেপ্টেম্বর কোরবান আলী রিফাত (১৬) নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। গত ১০ দিনে উপজেলাটিতে ডেঙ্গুতে চারজনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। অন্য উপজেলাগুলোতেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।

ক্রাশ প্রোগ্রাম নিয়ে প্রশ্ন

নগরবাসীর অভিযোগ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করলেও ৪১টি ওয়ার্ডে নিয়মিত ফগিং ও স্প্রে হচ্ছে না। মশা নিধনের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা ও মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন তাঁরা।

আকবরশাহ এলাকার বাসিন্দা হোসনে আরা বেগম বলেন, তাঁর পুত্রবধূ আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে দুইবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। মশার ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম নিয়মিত দেখা যায় না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

দুই নম্বর গেট এলাকার বাসিন্দা রেজাউল রাজু বলেন, সন্ধ্যার পর মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। কিন্তু সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম তেমন চোখে পড়ে না। তাঁর অভিযোগ, ক্রাশ প্রোগ্রাম অনেকটা লোকদেখানো হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক শিশুর অভিভাবক ইশতিয়াক আহমেদ মেহেরাজ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁর চার বছর বয়সী সন্তান জ্বরে ভুগছে। অনেক কষ্টে হাসপাতালের একটি বেড পেয়েছেন তাঁরা। তাঁর অভিযোগ, হালিশহরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হলেও সেখানে মশা নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত ওষুধ ছিটানো হচ্ছে না।

১৫৮ স্প্রে ও ৮৬ ফগার মেশিনে কার্যক্রম

চসিকের মশক নিধন কর্মকর্তা শরফুল ইসলাম মাহী জানান, মশা নিধনে ১৫৮টি স্প্রে মেশিন ও ৮৬টি ফগার মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া ৬০ সদস্যের একটি বিশেষায়িত দল মাঠে কাজ করছে। স্প্রে ও ফগিং—দুই পদ্ধতিতেই মশা নিধন কার্যক্রম চলছে।

বিটিআই ওষুধের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া, যা সরাসরি মশার পাকস্থলীতে আক্রমণ করে। ডিসেম্বর পর্যন্ত এ ওষুধ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা কমান্ডার ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, নিয়মিত ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাঁচটি হটস্পটকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ৪১টি ওয়ার্ডে একসঙ্গে কাজ করতে গেলে কিছুটা ঘাটতি থাকতে পারে। বিটিআই আগের তুলনায় ভালো কার্যকর হওয়ায় এটি ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

বৃষ্টি-তাপমাত্রা-আর্দ্রতায় বাড়ছে এডিস

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল ইনফেকশাস ডিজিজেসের ক্লিনিক্যাল ট্রপিক্যাল মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মামুনুর রশীদ বলেন, তিনটি কারণে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু বাড়ছে—থেমে থেমে বৃষ্টি, বিদ্যমান তাপমাত্রা এবং বাতাসে ৮০ শতাংশের বেশি আর্দ্রতা। এসব পরিবেশ এডিস মশার বংশবিস্তার ও বিস্তারের জন্য সহায়ক।

তাঁর মতে, বৃষ্টির পানির সংস্পর্শে এডিস মশার পেড়ে রাখা ডিম তিন দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ মশায় পরিণত হতে পারে। নভেম্বর পর্যন্ত এ পরিস্থিতি চলতে পারে। তবে থেমে থেমে বৃষ্টি কমে গেলে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও আগেই কমে আসতে পারে।

তিনি জানান, দেশে বর্তমানে চার ধরনের ডেঙ্গুতে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। চট্টগ্রামে বর্তমানে কোন ধরনের ডেঙ্গু বেশি ছড়াচ্ছে, তা জানতে নমুনা দেশের বাইরে পাঠানো হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. ফজলে রাব্বি বলেন, সিটি করপোরেশনের সঙ্গে মশা নিধনের ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করা হবে। নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর মৌসুম থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যৌথভাবে কাজ করছে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad