আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয় শিক্ষা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষের উৎপাদনশীলতা ও আয় বাড়িয়ে দারিদ্র্য কমাতে ভূমিকা রাখবে—অর্থনৈতিক উন্নয়ন তত্ত্বে এমনটাই বলা হয়। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয় ও ব্যয় জরিপের (এইচআইইএস) ২০০৫ ও ২০২২ সালের তথ্য বিশ্লেষণে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ বছরে সাক্ষর পরিবারের তুলনায় নিরক্ষর পরিবারে দারিদ্র্য কমার হার ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। নিম্ন ও উচ্চ—দুই দারিদ্র্যসীমার ক্ষেত্রেই নিরক্ষর পরিবারগুলোতে দারিদ্র্য হ্রাসের হার সাক্ষর পরিবারের চেয়ে তিন গুণের বেশি।
অতি দারিদ্র্য কমেছে বেশিবিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে নিম্ন দারিদ্র্যসীমা বা অতি দারিদ্র্যের হিসাবে নিরক্ষর খানা প্রধান পরিবারে দারিদ্র্যের হার ছিল ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ১ শতাংশে। অর্থাৎ ১৭ বছরে কমেছে ২৭ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট।
অন্যদিকে সাক্ষর খানা প্রধান পরিবারের ক্ষেত্রে একই সময়ে অতি দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ কমেছে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট।
উচ্চ দারিদ্র্যসীমার ক্ষেত্রেও প্রায় একই চিত্র দেখা যায়। ২০০৫ সালে নিরক্ষর পরিবারের দারিদ্র্যের হার ছিল ৫৪ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২২ সালে নেমে আসে ২৬ দশমিক ৯ শতাংশে। অর্থাৎ কমেছে ২৭ দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট।
সাক্ষর পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার ২৩ শতাংশ থেকে কমে ১৪ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। এখানে দারিদ্র্য কমেছে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বিস্তারঅর্থনীতিবিদ ও শ্রমবাজার বিশ্লেষণের আলোকে এই ব্যবধানের পেছনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বিস্তার এবং শ্রমবাজারের চাহিদা-জোগানের অসামঞ্জস্যকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ছিল প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার। ২০২২ সালে তা বেড়ে প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। অর্থাৎ ওই সময়ে অর্থনীতির আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে ঘিরে হয়েছে। নির্মাণ, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি ও বিভিন্ন সেবা খাতে স্বল্পশিক্ষিত ও অশিক্ষিত শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের ফলে কাজের ধরন বদলানোর পাশাপাশি নির্মাণ ও পরিবহন খাতেও শ্রমের চাহিদা বেড়েছে।
শহরাঞ্চলে অটোরিকশা চালানো, ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা বিভিন্ন সেবা খাতে কাজ করে স্বল্পশিক্ষিত অনেক তরুণ তুলনামূলক ভালো আয় করছেন। ফলে কিছু ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রাথমিক পর্যায়ের বেতনের চেয়েও এসব পেশায় আয় বেশি হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের চাপঅন্যদিকে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির ওপর নির্ভরশীল। সরকারি চাকরিতে সামাজিক মর্যাদা ও চাকরির নিরাপত্তার কারণে প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায় অনেক উচ্চশিক্ষিত তরুণ দীর্ঘ সময় চাকরির অপেক্ষায় থাকছেন। কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত স্বল্প বেতনের চাকরিতে যোগ দিচ্ছেন।
শ্রমবাজারের এই বাস্তবতা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্যের বিষয়টি সামনে আনছে। শিল্প উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকেও দীর্ঘদিন ধরে দক্ষ জনবল সংকটের কথা বলা হচ্ছে।
রেমিট্যান্সেও বড় ভূমিকানিরক্ষর ও স্বল্পশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য কমাতে আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসন ও রেমিট্যান্সও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শ্রমিকদের বড় অংশই স্বল্পশিক্ষিত।
নির্মাণ, কৃষি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও গৃহস্থালি কাজের মতো অনেক পেশায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা তুলনামূলক কম। ফলে স্বল্পশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বৈদেশিক শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে।
২০১০ সালের বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আগের দশকে রেমিট্যান্স বাংলাদেশের দারিদ্র্য কমানোর গতি বাড়াতে ভূমিকা রেখেছিল। প্রবাসী আয়ের একটি অংশ গ্রামে বাড়িঘর নির্মাণ, জমি কেনা ও স্থানীয় ব্যবসায় বিনিয়োগ হওয়ায় এর পরোক্ষ সুবিধাও স্থানীয় অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
মূল সমস্যা শিক্ষার মান ও শ্রমবাজারের অসামঞ্জস্যবিশ্লেষণে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মান ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্যের বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে অংশগ্রহণ বাড়লেও তাদের মৌলিক পড়া, লেখা ও গণিতের দক্ষতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না।
বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। পঞ্চম শ্রেণি শেষ করা অনেক শিক্ষার্থী মৌলিক ইংরেজি পাঠ এবং গণিতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না বলেও এসব প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাধ্যমিক পর্যায়ে পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষার কারণে শ্রমবাজারে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সীমিত থাকে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও শিল্প ও কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে পাঠ্যক্রমের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
শিক্ষার মানোন্নয়নে জোর দেওয়ার তাগিদদারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য শিক্ষার মানোন্নয়নের পাশাপাশি কর্মমুখী দক্ষতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিটি শিশুর মৌলিক পড়া, লেখা ও গণিতের দক্ষতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি আইটি, ইলেকট্রনিক্স, মেকানিক্স ও কৃষি-প্রযুক্তির মতো বাজারমুখী কারিগরি দক্ষতা যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানো, আধুনিক ল্যাব স্থাপন এবং শিক্ষার মান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও শিল্প ও শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠ্যক্রম পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতগুলোকে ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনা গেলে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ করে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে দেশের এলডিসি উত্তরণের প্রক্রিয়াও এগোবে। ফলে এই অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে দক্ষ মানবসম্পদ ও মানসম্মত শিক্ষার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

মোঃ রায়হান চৌধুরী,(নিজস্ব প্রতিবেদক)