সরেজমিনে দেখা যায়, উত্তরাঞ্চলের রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁ, পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা এবং কুড়িগ্রামসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর কয়েকশ এলপিজি গ্যাস পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস মজুর থাকার পরেও বাড়তি দামের আশায় তারা গ্রাহককে গ্যাস সরবরাহ করছেন না। অনেকে পাম্পে তালা দিয়ে সরে পড়েছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন মেশিন নষ্ট। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিটি পাম্পে এলপিজি গ্যাস মজুত রয়েছে।
দিনাজপুর দশ মাইল এলপিজি গ্যাস পাম্পের প্রতিবেশী কয়েকজন দোকানদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দশ মাইলের এলপিজি গ্যাস পাম্পে পর্যাপ্ত পরিমাণ গ্যাস মজুত রয়েছে। কারণ তারা যেদিন থেকে বলা শুরু করেছে পাম্পে গ্যাস নেই, তার আগের দিন গ্যাসের গাড়ি এসে তাদের গ্যাস দিয়ে গেছে। কিন্তু বাড়তি দামের আশায় এবং সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এখানকার পাম্প মালিকেরা এই হটকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে জনগণের পকেট কেটে নিজেদের ফায়দা হাসিল করতে এমন কৌশল অবলম্বন করেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাম্প মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এলপিজি গ্যাসের সংকট থাকত না।
তারা আরো বলেন, দিনাজপুর দশ মাইল হয়ে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগডড়ে যাওয়ার পথে হাইওয়ে সড়কের পাশে অবস্থিত সব গ্যাস পাম্পে পর্যাপ্ত গ্যাস রয়েছে, প্রশাসন একটু তদন্ত করলেই পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাসের সন্ধান মিলবে।
লালমনিরহাট কাকিনা গ্যাস পাম্পের এক কর্মচারী আমার দেশকে বলেন, ‘পাম্পে গ্যাস আছে কিন্তু মালিক বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। কারণ তেলের দাম বেড়েছে, এ কারণে গ্যাসের দামও বাড়বে। দাম বাড়লে বাস মালিকেরা বেশি টাকা পাবেন, আমাদের সুবিধা দেবেন।’
গোবিন্দগঞ্জে এলপিজি পাম্প কর্মচারী মুরশিদুল ইসলাম বলেন, ‘পাম্প মালিকের সিদ্ধান্তের বাইরে কর্মচারীরা যেতে পারবে না। রাতের বেলা আমাদের বলা হয়েছে পাম্পে এলপিজি নেই, গ্রাহক আসলে আমরা সেটাই বলতেছি। এখানে আমাদের কিছুই করার নেই।’
রংপুর সদর উপজেলার পাগলাপীর এলাকার এলপিজি গ্যাস পাম্পের কর্মচারী মুশফিক ও সোহাগ মিয়া বলেন, ‘আশপাশের যে পাঁচ-ছয়টি এলপিজি পাম্প আছে, সেই গ্যাস পামগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ গ্যাস মজুত রয়েছে। আমাদের কিছু করার নেই, কারণ আমরা পাম্পে চাকরি করি। মালিক যেভাবে বলেছেন, সেভাবেই আমাদের চলতে হয়।’
গাড়িচালক মিজান, মিলন ও সাজু এবং মোজাফফর আমার দেশকে বলেন, ‘প্রায় চার দিন ধরে এলপিজি গ্যাস পাম্পের মালিকেরা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রেখেছেন। তেলের দাম বেশি হওয়ায় আমরা তেল কিনে গাড়ি চালাতে পারছি না। গ্যাস সরবরাহ না করায় আমরা যারা ভাড়ায় গাড়ি চালাই, তারা বিপাকে পড়েছি। কারণ তেলের দাম বেশি হওয়ায় আমরা গ্যাসের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে গাড়ি চালাই। কিন্তু পাম্প মালিকেরা গ্যাস মজুত রেখেও বিভিন্ন অজুহাতে আমাদের গ্যাস দিচ্ছেন না।’
তারা আরো বলেন, ‘কোন কোন পাম্পে এলপিজি মজুত রয়েছে, আমরা জেনেশুনে খোঁজ নিয়ে সেখানে গাড়ি নিয়ে যাওয়ার পরেও আমাদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন। কেউ বলছেন গ্যাস নেই, আবার কেউ বলছেন মেশিন নষ্ট হয়েছে, ঢাকা থেকে মিস্ত্রি আসতে সপ্তাহখানেক লাগবে।
তারা বাড়তি পয়সার আশায় নানান অজুহাত দেখিয়ে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রেখেছেন। আমরা চাই, প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাম্পগুলোতে অভিযান চালালে গ্যাস সরবরাহ ঠিক থাকত গাড়ির মালিক এবং এলপিজি ব্যবহারকারী গ্রাহকেরা কোনো সমস্যায় পড়ত না।’
মিঠাপুকুর হাসনা ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার জগদীশ আমার দেশকে বলেন, ‘ভাই, আমরা তো শুধু এলপিজি বিক্রি করি না, এখানে আমাদের পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেন রয়েছে। আমাদের এলপিজি পর্যাপ্ত রয়েছে, কিন্তু মেশিন নষ্ট হওয়ার কারণে আমরা গ্রাহককে গ্যাস দিতে পারছি না।’ যেদিন সবাই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করল, সেদিনই আপনাদেরও মেশিন নষ্ট হলোÑএমন প্রশ্ন করা হলে ম্যানেজার সঠিক জবাব না দিয়ে মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
বিসমিল্লাহ এলপিজি গ্যাস পাম্পের ম্যানেজার রায়হান কবির আমার দেশকে বলেন, ‘আমরা যখন এলপিজি গ্যাস পাম্প চালু করি, তখন গ্যাসের লিটার ছিল ৪৩ টাকা। পরে দাম বাড়িয়ে করা হয় ৪৮ টাকা। পরে ধাপে ধাপে ৫১ টাকা থেকে শুরু করে ৮৯ টাকা পর্যন্ত গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়।’
আবার কয়েক সপ্তাহ পরে ছয় টাকা কমিয়ে ৮৩ টাকা দাম নির্ধারণ করা হয়। এর পরে কমে হয় ৭৫ টাকা। বর্তমানে ৭৩.০৯ পয়সা দরে গ্যাস পাম্পগুলো গ্যাস বিক্রি করছে। কিন্তু যারা শুধু এলপিজি গ্যাস পাম্প করেছেন, তাদের অসহায়ের মতো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর ভরসা করে থাকতে হয়।
অপরদিকে মজা লুটছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এই মুহূর্তে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো কারণ আছে বলে তিনি মনে করেন না বলে জানান।
রংপুর জেলা জজকোর্টের এপিপি অ্যাডভোকেট আখতারা ওসমানী আমার দেশকে বলেন, এলপিজি গ্যাস পাম্প মালিকেরা আওয়ামী লীগ সিন্ডিকেটের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে জনগণের পকেট কাটার ব্যবস্থা করেছেন। তারা দ্রুত জনসাধারণকে গ্যাস সরবরাহ না করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বদরগঞ্জের মন্ডলের হাট এলপিজি গ্যাস পাম্পের মালিক আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, ‘আমরা ছোট ব্যবসায়ী। আমাদের শুধু এলপিজি গ্যাস পাম্প স্টেশন রয়েছে। সরাসরি আমরা কোম্পানি থেকে গ্যাস কিনি। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আমাদের জানিয়েছেন, এখন গ্যাস দেওয়া যাবে না। কারণ কয়েক দিনের মধ্যে বাধ্য হয়ে সরকার এলপিজি গ্যাসের দাম বাড়াবে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ফ্রেশ, বেক্সিমকো ও যমুনাসহ দেশের নামকরা এলপিজি গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের বিভিন্ন জেলায় নিজেরাও এলপিজি গ্যাস পাম্প বসিয়ে ব্যবসা করার পাশাপাশি অন্য পাম্প মালিকদের গ্যাস সরবরাহ করে থাকেন। তাদের পামগুলোতে এলপিজি মজুত থাকার পরেও গ্রাহকদের তারা গ্যাস দিচ্ছেন না। মূলত তারাই সিন্ডিকেট করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে গ্যাসের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারায় লিপ্ত রয়েছেন বলে তিনি জানান।
রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বিএনপির মহানগর কমিটির আহ্বায়ক শামসুজ্জামান সামু আমার দেশকে বলেন, ‘গ্যাস থাকতেও সরবরাহ না করা মানে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার পাঁয়তারা। আমি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে অনুরোধ করব, যারা এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত, তাদের শনাক্ত করে দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার। পাশাপাশি পাম্পমালিকদের বলতে চাই, তারা যেন গ্রাহকদের হয়রানি না করেন।’
রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, রংপুর অঞ্চলের এলপিজি গ্যাস পাম্পে মজুত থাকার পরেও যারা গ্যাস সরবরাহ করছেন না, এ বিষয়ে অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরো বলেন, সরকার নানান প্রতিকূলতা অতিক্রম করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সবকিছু করছেন। সে ক্ষেত্রে কোনো সিন্ডিকেট বা জনগণকে যারা জিম্মি করে নিজেদের ফায়দা হাসিল করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে।’

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক