সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, দেশজুড়ে তদন্তে কৃষি মন্ত্রণালয়

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৯ দুপুর
  • ৩০২৩ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

সারা দেশে সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের তদারকি কমিটির সুপারিশে নীতিমালা লঙ্ঘন করে অনভিজ্ঞ ও পছন্দের ব্যক্তিদের ডিলার নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগে কৃষি মন্ত্রণালয়ে কয়েকশ আবেদন জমা পড়েছে। অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাইয়ের পাশাপাশি গুরুতর অনিয়মের সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো খতিয়ে দেখছে মন্ত্রণালয়।


কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন এলাকার আবেদনকারীরা মন্ত্রণালয়ে এসে অভিযোগ করছেন। গত রোববারও কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতার পক্ষ থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগ জানানো হয়।


সোমবার ঝিনাইদহে একটি অনুষ্ঠানে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, আইনি ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সারা দেশে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠার বিষয়টি সামনে এসেছে।


মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দুর্গাপূজার সরকারি ছুটির আগে শেষ কর্মদিবস সোমবারও অনিয়মের অভিযোগে পাঁচ-ছয়টি আবেদন জমা পড়ে। এর আগে একই ধরনের প্রায় ৫০০ আবেদন জমা হয়েছে।


ভরা মৌসুমের আগে সমাধানের তাগিদ


আগামী নভেম্বর থেকে দেশে সারের ভরা মৌসুম শুরু হচ্ছে। এ সময় আলু, ভুট্টা, গম ও শীতকালীন সবজি চাষে সারের চাহিদা বাড়ে। এর মধ্যে ডিলার নিয়োগ নিয়ে জটিলতা পুরোপুরি না কাটায় মাঠপর্যায়ে সার সরবরাহ ও বিতরণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।


তবে দেশে সারের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে বলে জানিয়েছেন সার ব্যবস্থাপনা শাখার কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, সৌদি আরব, বেলারুশ, মরক্কো ও কানাডা থেকে সার আমদানির কার্যক্রম চলছে। চাহিদা বাড়ার আগেই ডিলার নিয়োগসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে গুরুত্ব দিচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়।


চার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত


ডিলার নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগের মধ্যে চারটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এগুলো হলো—উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের তদারকি কমিটির সুপারিশে অনিয়ম, একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তিকে নিয়োগ, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ডিলার নিয়োগের সুপারিশের কারণ এবং নীতিমালা লঙ্ঘন করে কাউকে ডিলার নির্বাচনের কারণ।


মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি, বিভিন্ন পর্যায়ের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও আমলাদের কেউ কেউ পছন্দের ব্যক্তিদের চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে কৃষিমন্ত্রী ও সচিবের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। তবে এসব তদবির আমলে না নিয়ে বাছাই কমিটির তালিকাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে তাদের দাবি।


কৃষি সচিব সেলিম খান বলেন, মন্ত্রণালয় নীতিমালা ও জেলার সুপারিশের ভিত্তিতে সারা দেশে সার ডিলার নিয়োগ দিয়েছে। প্রজ্ঞাপন জারির পর বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযোগ আসছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের তদারকি কমিটির সুপারিশে গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেলে কৃষিমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে আমলে নেওয়ার মতো অভিযোগের সংখ্যা কম। গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে কিছু ডিলারের নিয়োগ পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।


মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন


উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক। ডিলার নিয়োগের সুপারিশ ও যাচাই-বাছাইয়ে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।


স্থানীয় ব্যবসায়ী ও আবেদনকারীদের অভিযোগ, নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির হয়েছে। কোথাও কোথাও জনপ্রতিনিধিদের আধাসরকারি চিঠি (ডিও লেটার) ব্যবহার এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে তদবিরের জন্য অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।


অভিযোগ তদন্তে কয়েকটি জেলার প্রশাসন কমিটি গঠন করেছে। গত ১৩ অক্টোবর যশোরের জেলা প্রশাসক আশেক এলাহী তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। মনিরামপুর, অভয়নগর ও চৌগাছা উপজেলার সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।


অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—নিজস্ব গুদাম নেই এমন ব্যক্তি ও অনভিজ্ঞদের ডিলারের জন্য সুপারিশ, ইউএনওর তালিকায় নিচের দিকে থাকা ব্যক্তিকে জেলা পর্যায়ে অগ্রাধিকার দেওয়া, রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রভাবিত হওয়া এবং একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে নিয়োগ দেওয়া।


পাইকগাছায় তালিকা পরিবর্তনের অভিযোগ


খুলনার পাইকগাছায় সার ডিলার নিয়োগে অস্বচ্ছতা, অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ ও দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, উপজেলা কমিটির পাঠানো তালিকায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। পরে কয়েকটি ইউনিয়নে তালিকার প্রথম দিকে থাকা আবেদনকারীদের বাদ দিয়ে অন্যদের চূড়ান্ত করা হয়েছে।


অভিযোগ অনুযায়ী, কপিলমুনি ইউনিয়নে প্রথম স্থানে থাকা মেসার্স পপি এন্টারপ্রাইজের পরিবর্তে তৃতীয় স্থানে থাকা মেসার্স দৃশান এন্টারপ্রাইজকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ষোলাদানা ইউনিয়নে এসকেআর এন্টারপ্রাইজের পরিবর্তে মেসার্স সুমি এন্টারপ্রাইজ এবং গড়াইখালী ইউনিয়নে মেসার্স যাবিন স্টোরের পরিবর্তে মেসার্স অর্ণব এন্টারপ্রাইজকে ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে।


তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত বলেন, কমিটির বিবেচনা ও নীতিমালা অনুযায়ী যাকে প্রথম স্থানে রাখার প্রয়োজন, তাকেই রাখা হয়েছে। এরপরও সুপারিশে অনিয়ম থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


বাঘারপাড়া ও ডুমুরিয়ায়ও অভিযোগ


যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার বাসুয়াড়ী ইউনিয়নে হাবিবুর রহমানকে সার ডিলারশিপ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী সাজ্জাদ হোসেন। তার অভিযোগ, একাধিক মামলার আসামি এবং নিজস্ব গুদাম নেই—এমন একজনকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে।


অভিযোগ অস্বীকার করে হাবিবুর রহমান বলেন, নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করায় প্রতিপক্ষরা তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলছেন। সব নিয়ম মেনেই তিনি ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে দাবি করেন।


খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়া বাজারে মেসার্স মোল্ল্যা কৃষি ভান্ডারের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন রিয়াদ মোহাম্মদ। তার নিজস্ব সার বিক্রির দোকান ও গুদাম নেই—এমন অভিযোগ তুলে স্থানীয় ব্যবসায়ী সবুজ মোড়ল ডিলারশিপ বাতিলের আবেদন করেছেন।


অন্যদিকে ডুমুরিয়ার মাগুরখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি সুকৃতি কুমার মণ্ডলের বিরুদ্ধেও একটি মিষ্টির দোকানকে গুদাম হিসেবে দেখিয়ে ডিলারশিপ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, দোকানটি আগে অন্যের কাছে ভাড়া দেওয়া ছিল এবং নিয়ম মেনেই তিনি ডিলারশিপ পেয়েছেন।


ডুমুরিয়ায় ডিলার নিয়োগ নিয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে ইউএনও সবিতা সরকার পরে যোগাযোগ করবেন বলে জানান।


অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা


সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, জালিয়াতি বা প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। মিথ্যা তথ্য দেওয়া, অনুপযুক্ত গুদাম দেখানো কিংবা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রমাণ মিললে ডিলারশিপ বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।


সংশ্লিষ্টদের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে ভরা মৌসুম শুরুর আগেই ডিলার নিয়োগসংক্রান্ত জটিলতার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সার বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad