২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, সকাল সাড়ে নয়টা। বসন্তের আগমনী বার্তায় তেহরানের আকাশ ছিল একেবারেই পরিষ্কার। প্রতিদিনের মতোই অফিসগামী মানুষের ব্যস্ততা, স্কুলমুখী শিশুদের কোলাহল আর মেট্রোর চিরচেনা গুঞ্জনে জেগে উঠেছিল ইরানের রাজধানী। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়।
পরপর কয়েকটি বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে পুরো শহর। টেলিভিশন ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়েছে মধ্য তেহরানের পাস্তুর এলাকায় অবস্থিত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির বাসভবনসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সামরিক স্থাপনা।
পাস্তুর এলাকাটি লেখকের বাসা থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে। চোখের সামনে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখে এক নিমেষেই সাংবাদিক পরিচয়ের ওপর চেপে বসল পিতৃত্বের উদ্বেগ। দুই ছেলে তখন স্কুলে। চারদিকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা আর তীব্র আতঙ্কের মাঝে কোনো রকমে মোটরসাইকেল জোগাড় করে যখন ছেলেদের নিয়ে ঘরে ফিরলেন, তখনো তিনি জানতেন না যে—এটি একটি দীর্ঘ ৪০ দিনের যুদ্ধের সূচনা মাত্র।
যুদ্ধকালীন তেহরান: প্রধান সংকটের ক্ষেত্রসমূহযুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে সর্বোচ্চ নেতাসহ শীর্ষস্থানীয় সামরিক কমান্ডারদের শাহাদাতের খবর এবং আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়া শহরটিকে এক গভীর তথ্যগত অবরুদ্ধতার মধ্যে ফেলে দেয়। এই দীর্ঘ ৪০ দিনে নাগরিক জীবনের প্রধান তিনটি চ্যালেঞ্জ ও তার চিত্র ছিল নিম্নরূপ:
১. মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও শিশুদের ভার্চ্যুয়াল যুদ্ধ পারিবারিক উদ্বেগ: সশরীরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হলেও দ্রুত অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়। বাস্তবতা: একদিকে কম্পিউটারের পর্দায় শিক্ষকের গণিত বা ইতিহাস পাঠদান চলছে, অন্যদিকে ঘরের জানালা কাঁপিয়ে দূরে আছড়ে পড়ছে ক্ষেপণাস্ত্র। শিশুরা প্রতিদিন প্রশ্ন করত—“আজ কি আবার হামলা হবে? আমরা কি দেশে যেতে পারব?” ২. জনশূন্য রাস্তা বনাম সচল গণপরিবহন আংশিক স্থানান্তর: তেহরানের বহুতল ভবনগুলোর অনেক পরিবারই সাময়িকভাবে উত্তরাঞ্চল বা নিজেদের গ্রামের বাড়িতে চলে যান। (যেমন লেখকের ভবনের ৮টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ৫টিই খালি হয়ে গিয়েছিল)। যোগাযোগের প্রাণরেখা: ফাঁকা রাস্তায় কোনো ট্যাক্সি না মিললেও পুরো যুদ্ধকালীন সময়ে তেহরানের মেট্রো, বাস ও বিআরটি সেবা এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ হয়নি। সাধারণ মানুষের কাছে মাটির নিচের মেট্রো স্টেশনগুলো যাতায়াতের পাশাপাশি একটি নিরাপদ আশ্রয়ের অনুভূতিও তৈরি করেছিল। ৩. অর্থনীতি ও বাজার নিয়ন্ত্রণক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইন ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। রুটি, চাল, তেল ও দুগ্ধজাত পণ্যের কোনো সংকট ছিল না। ব্যাংকিং ব্যবস্থা সীমিত সময়ের জন্য হলেও প্রতিদিন সচল রাখা হয়েছিল।
বহুমাত্রিক সমন্বিত প্রতিরোধ ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ
একটি আধুনিক যুদ্ধ শুধু ফ্রন্টলাইনে নয়, বরং রাষ্ট্রের ভেতরকার অর্থনৈতিক ও মানবিক ব্যবস্থাপনার ওপর টিকে থাকে। এই ৪০ দিনে ইরানের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিরোধের একটি সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান নিচে দেওয়া হলো:
সেবামূলক খাত / উদ্যোগ
গৃহীত পদক্ষেপ ও প্রভাব
আর্থিক প্রবাহ সচল রাখা
প্রথম প্রহরেই জনগণের নগদ অর্থ প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সামাজিক ভর্তুকি ও সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারিত সময়ের আগেই পরিশোধ করা হয়।
ব্যবসায়িক প্রণোদনা
ক্ষতিগ্রস্ত ছোট-মাঝারি উৎপাদন খাতকে টিকিয়ে রাখতে বিশেষ ঋণ ও দ্রুত কাঁচামাল খালাসের ব্যবস্থা করা হয়।
রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি
যুদ্ধকালীন উদ্ধার তৎপরতা ও মানবিক সহায়তায় প্রায় ২৮,০০০ উদ্ধারকর্মী সার্বক্ষণিক সক্রিয় ছিলেন।
আন্তর্জাতিক মানবিক সাহায্য
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও ইরাকসহ প্রায় ৩০টি মিত্র ও নিরপেক্ষ দেশ থেকে আসা ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী যুদ্ধপ্রভাবিত ১৯টি প্রদেশে নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিতরণ করা হয়।
তেহরান প্রবাসী বাংলাদেশিদের লড়াই ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তনতেহরানে বসবাসরত প্রায় ৪০০ বাংলাদেশির (দূতাবাসের কর্মকর্তা, রেডিও তেহরানের সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী) জন্য এই যুদ্ধ ছিল চরম বিচ্ছিন্নতার। আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় বাংলাদেশে থাকা স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। সে সময় লেখকের কাছে বিশেষ ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট থাকায় তিনি অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগকেন্দ্র হিসেবে কাজ করেন; প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপদ থাকার বার্তা স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেন।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কায় বাংলাদেশ দূতাবাস দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে:
১৮৬ জন বাংলাদেশি সড়কপথে প্রতিবেশী আজারবাইজান হয়ে সরকারের বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে নিরাপদে ঢাকায় পৌঁছান। অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ৫ জন নাবিকসহ আরও ১৪ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরে আসেন। ‘জানফিদা-এ-ইরান’: ভয়হীন সমাজ ও প্রতিরোধের সংস্কৃতিপশ্চিমা গণমাধ্যমে যখন তেহরানকে একটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও পলায়নপর নগরী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলছিল, তখন বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
"২৩ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক সংকট দেখেছি, কিন্তু ইরানিদের মতো এমন ভয়ডরহীন জাতি খুব কমই আমার চোখে পড়েছে।"
আকাশে যখন শত্রুর যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দ শোনা যেত, মানুষ মাটির নিচের বাঙ্কারে না লুকিয়ে সপরিবারে বাসার ছাদে বা জানালায় গিয়ে দাঁড়াত। ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র যখন শত্রুর আঘাত রুখে দিত, তখন তারা সেই দৃশ্য মোবাইলে ভিডিও করত এবং সমস্বরে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি তুলত।
জাতীয় সংহতির দুটি অভূতপূর্ব চিত্র: অনলাইন নিবন্ধন: দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জীবন উৎসর্গের অঙ্গীকার নিয়ে গড়ে ওঠা ‘জানফিদা-এ-ইরান’ (ইরানের জন্য আত্মত্যাগ) আন্দোলনে রেকর্ড ৩ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ৯২৩ জন মানুষ নিজেদের নাম নথিভুক্ত করেন। রাতের রাজপথ: টানা ১০৬ দিন ধরে প্রতি রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ, সাধারণ পরিবার ও শ্রমজীবী মানুষ ব্যানার ও পতাকা হাতে নিয়ে সরকারের সমর্থনে রাজপথে মুখর থেকেছেন। অনেক সময় সমাবেশের পাশেই ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়লেও ধোঁয়া ম্লান হওয়ার আগেই তারা দ্বিগুণ উৎসাহে পুনরায় স্লোগান তুলেছেন। ছাই থেকে উঠে দাঁড়ানো এক পরীক্ষিত রাজধানী৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় অবশেষে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী অধ্যায় শেষে তেহরান আবার তার চেনা ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে। পার্কগুলোতে শিশুদের কোলাহল ফিরছে, বন্ধ দোকানপাট খুলছে।
যদিও অনেক পরিবার এখনো তাদের পুরোপুরি গুছিয়ে উঠতে পারেনি, দেয়ালের ফাটল বা ভাঙা জানালার চেয়েও গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে বহু মানুষের মনে—তবুও তেহরান নুয়ে পড়েনি। এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে, একটি শহরের আসল শক্তি তার কংক্রিটের অট্টালিকায় নয়, বরং তার মানুষের অদম্য মনোবল, অবিশ্বাস্য অভিযোজন ক্ষমতা আর জাতীয় ঐক্যের মাঝে নিহিত। ৪০ দিনের অগ্নিপরীক্ষা শেষে তেহরান আজ এক ক্ষতবিক্ষত কিন্তু অপরাজিত রাজধানী।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক