ঝিনাই নদীর তীরে স্থাপত্যের বিস্ময়—২০১ গম্বুজের মসজিদে ইতিহাস, নান্দনিকতা ও আত্মিক প্রশান্তির অনন্য মিলন

  • এইচএম মোকাদ্দেস,নির্বাহী সম্পাদক
  • আপলোড সময় : ০৫ জুলাই ২০২৬, ১২:৪৮ দুপুর
  • ১৩৩২৬ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

টাঙ্গাইলের গোপালপুরে বিশ্বের অন্যতম গম্বুজসমৃদ্ধ মসজিদ; সুউচ্চ মিনার, মনোমুগ্ধকর কারুকাজ ও মানবকল্যাণমূলক কার্যক্রমে প্রতিদিনই ভিড় করছেন দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীরা।

টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ঝিনাই নদীর পূর্ব তীরে দাঁড়িয়ে থাকা ২০১ গম্বুজের মসজিদ আজ দেশের অন্যতম দর্শনীয় ধর্মীয় স্থাপনা। দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য, সুউচ্চ মিনার, নান্দনিক কারুকাজ এবং ধর্মীয় ও মানবকল্যাণমূলক কার্যক্রমের সমন্বয়ে এটি ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশের ভ্রমণপিপাসু ও মুসল্লিদের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।

ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল হয়ে গোপালপুরের পথে এগোতেই সবুজে ঘেরা গ্রামীণ জনপদ ও আঁকাবাঁকা পথ ভ্রমণকে করে তোলে আরও মনোমুগ্ধকর। উপজেলা সদর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার পশ্চিমে দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামে পৌঁছানোর আগেই দূর থেকে চোখে পড়ে আকাশছোঁয়া সুউচ্চ মিনার। ঝিনাই নদীর শান্ত পরিবেশের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল এই মসজিদ প্রথম দর্শনেই দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

প্রায় ১৫ বিঘা জমির ওপর নির্মিত মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে। বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম কল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে নির্মিত এ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০০ কোটিরও বেশি টাকা বলে জানা যায়। বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যতম অধিক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ হিসেবে পরিচিত।

মসজিদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর ২০১টি গম্বুজ। মাঝখানে রয়েছে প্রায় ৮১ ফুট উচ্চতার একটি প্রধান গম্বুজ, যার চারপাশে সুনিপুণভাবে নির্মাণ করা হয়েছে আরও ২০০টি ছোট গম্বুজ। নীল, সাদা ও সোনালি রঙের টাইলসের অলংকরণ পুরো স্থাপনাটিকে দিয়েছে অনন্য সৌন্দর্য।

মসজিদের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে নির্মিত প্রায় ৪৫১ ফুট উচ্চতার প্রধান মিনারটি বিশ্বের অন্যতম উঁচু কংক্রিটের মিনার হিসেবে পরিচিত। এছাড়া চার কোণায় রয়েছে ১০১ ফুট উচ্চতার চারটি মিনার এবং প্রধান গম্বুজের পাশে আরও চারটি ৮১ ফুট উচ্চতার মিনার। সব মিলিয়ে নয়টি মিনারের সুবিশাল বিন্যাস মসজিদের স্থাপত্যকে করেছে আরও রাজকীয়।

দোতলাবিশিষ্ট বর্গাকৃতির মসজিদটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ১৪৪ ফুট করে। একসঙ্গে প্রায় ১৫ হাজার মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের অভ্যন্তরে আধুনিক ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে পবিত্র কোরআনের আয়াত খোদাই করা হয়েছে। মার্বেল পাথর, পিতল ও উন্নতমানের টাইলসের সমন্বয়ে তৈরি অভ্যন্তরীণ নকশা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। প্রধান প্রবেশদ্বার নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় ৫০ মণ পিতল।

আসরের আজানের সময় ঝিনাই নদীর বাতাস আর সুমধুর আজানের ধ্বনি পুরো পরিবেশকে করে তোলে প্রশান্তিময়। নামাজ আদায়ের পর অনেক দর্শনার্থী কিছুক্ষণ নীরবে বসে ইবাদত ও ধ্যানমগ্ন সময় কাটান। তাদের মতে, এই মসজিদে নামাজ আদায় এক ভিন্নধর্মী আত্মিক অনুভূতির জন্ম দেয়।

মসজিদটি শুধু ইবাদতের স্থান নয়; এটি একটি মানবকল্যাণমূলক কমপ্লেক্সও। এখানে দাতব্য হাসপাতাল, এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম, অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা এবং বিশিষ্ট অতিথিদের জন্য আধুনিক হেলিপ্যাড নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এটি একটি সামাজিক সেবাকেন্দ্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বিকেলের পড়ন্ত রোদে ২০১টি গম্বুজের সোনালি আভা ঝিনাই নদীর জলে প্রতিফলিত হয়ে সৃষ্টি করে নয়নাভিরাম দৃশ্য। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত দর্শনার্থী এই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে এখানে ছুটে আসেন।

যেভাবে যাবেন

বাংলাদেশের যেকোনো স্থান থেকে প্রথমে টাঙ্গাইল জেলা সদরে পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে গোপালপুর উপজেলার দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামে অবস্থিত ২০১ গম্বুজের মসজিদ। টাঙ্গাইল থেকে বাস বা সিএনজিযোগে গোপালপুর এবং সেখান থেকে অটোরিকশা, ইজিবাইক বা সিএনজিতে সহজেই মসজিদে পৌঁছানো যায়। এছাড়া ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি গোপালপুরগামী বাসও চলাচল করে।

স্থাপত্যের সৌন্দর্য, ধর্মীয় আবহ, প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং মানবকল্যাণমূলক উদ্যোগ—সব মিলিয়ে টাঙ্গাইলের ২০১ গম্বুজের মসজিদ আজ বাংলাদেশের অন্যতম অনন্য দর্শনীয় স্থান হিসেবে নিজস্ব মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad