মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের আবারও ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে দেশটির সরকার। মিয়ানমারের সাম্প্রতিক এই অবস্থানের পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের ফেরাতে মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
তবে মিয়ানমার হঠাৎ করে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে কেন এমন বিবৃতি দিল—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এর মাধ্যমে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
মিয়ানমার বরাবরই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তাদের ‘বাঙালি’ বলে দাবি করে আসছে। দেশটির সাম্প্রতিক বিবৃতিতেও বলা হয়েছে, ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব মিয়ানমারে নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমারের অনাগ্রহ স্পষ্ট করতেই পুরোনো ‘বাঙালি’ বিতর্কটি নতুন করে সামনে আনা হয়েছে। তাদের ধারণা, এটি মিয়ানমারের জান্তা সরকারের দীর্ঘদিনের কৌশলেরই ধারাবাহিকতা।
আরকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নূরুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গারা রাখাইনে জাতিগত নিধনের শিকার হয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মি—কেউই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আগ্রহী নয়। তার মতে, মিয়ানমারের নতুন বিবৃতিতেও সেই অবস্থানেরই প্রতিফলন ঘটেছে।
২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ব্যাপক নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে ও পরে বিভিন্ন সময়ে আরও প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসেছে।
আরও জটিল হচ্ছে পরিস্থিতি?
নূরুল ইসলাম বলেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে। ফলে তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে প্রত্যাবাসনে সম্মতি দেওয়া দেশটির জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন। তার দাবি, রোহিঙ্গারা রাখাইন ও মিয়ানমারের নাগরিক হলেও দেশটির সরকার শুরু থেকেই তাদের ফেরানোর বিষয়ে প্রকৃত সদিচ্ছা দেখায়নি।
মিয়ানমারের ১৩৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তালিকাতেও রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছে।
গত ২৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানিয়েছিলেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ ৮৯ হাজার।
তবে মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বিবৃতি থেকে বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ও পরিচয় নিয়ে যে অবস্থান তুলে ধরছে, সেটিকে দেশটি গুরুত্ব দিতে চাইছে না। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, প্রত্যাবাসনের বিষয়ে নিজেদের অনাগ্রহই আবারও স্পষ্ট করেছে মিয়ানমার।
মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম মনে করেন, ‘বাঙালি’ বিতর্কে বাংলাদেশের জড়িয়ে পড়া উচিত নয়। তার মতে, বাংলাদেশের মূল অবস্থান হওয়া উচিত—মিয়ানমারকে তার নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে হবে।
তিনি বলেন, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতেই মিয়ানমার সরকার বিবৃতির মাধ্যমে একটি কৌশল প্রকাশ করেছে।
হঠাৎ করে এই কৌশল সামনে আনার সম্ভাব্য কারণ প্রসঙ্গে এমদাদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডরের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। মিয়ানমার সরকার প্রকৃত অর্থে এ ধরনের উদ্যোগ চায় না—নতুন করে ‘বাঙালি’ বিতর্ক সামনে আনার পেছনে এটিও একটি কারণ হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
কারণ, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক ও সহজ না হলে করিডরের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সব মিলিয়ে, মিয়ানমারের নতুন অবস্থান রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও পরিচয়ের পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক