বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বাড়ছে লোডশেডিং, সংকটের নেপথ্যে জ্বালানি ঘাটতি

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২১ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৪১ দুপুর
  • ১১২১০ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

দেশজুড়ে আবারও তীব্র হয়ে উঠেছে বিদ্যুৎ সংকট। বিশেষ করে গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। কোথাও কোথাও দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাহকেরা। একই সঙ্গে বিদ্যুতের বিল বেড়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা এবং শিল্পকারখানাগুলোও পড়েছে বাড়তি চাপে।

সাভারের এক পল্লী বিদ্যুৎ গ্রাহক রোজিনা বলেন, বিদ্যুৎ ঘন ঘন চলে যাচ্ছে, অথচ বিলও বেশি আসছে। প্রিপেইড মিটারে ঘন ঘন টাকা রিচার্জ করতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা পাঁচ কোটির বেশি। এর মধ্যে পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক প্রায় ৩ কোটি ৭১ লাখ। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে গ্রাম ও মফস্বলের মানুষকে।

শিল্প খাতেও পড়েছে এর নেতিবাচক প্রভাব। গাজীপুরের এক কারখানা মালিক জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তার কারখানার উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতাদের চাপও বাড়ছে।

সক্ষমতা আছে, তবু সংকট

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ক্যাপটিভ পাওয়ারসহ দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা প্রায় ৩৩ হাজার মেগাওয়াট। ভারত ও নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানিসহ গ্রিড পর্যায়ে সক্ষমতা রয়েছে ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট।

চলতি বছরের মে মাসে এক দিনে সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ২০১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড হয়েছে। অথচ একই সময়ে লোডশেডিংও বেড়েছে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, ১০ আগস্ট এক দিনে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, চলতি গ্রীষ্মে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রাথমিক জ্বালানির সংকটের কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে এলএনজি আমদানিতে সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্তত দুই বছর সময় প্রয়োজন হতে পারে। এ খাতের জন্য ১০ বছর মেয়াদি একটি কর্মপরিকল্পনাও সংসদে উপস্থাপনের কথা রয়েছে।

সংকটের পেছনে কী

বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে তেল ও আমদানিনির্ভর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। বিশেষ আইনের মাধ্যমে বিনা দরপত্রে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।

এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে জ্বালানি সরবরাহ বাড়েনি। গ্যাস ও কয়লা উত্তোলনে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। ব্যয়বহুল জ্বালানি এবং প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার কারণে বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক ব্যয়ও বেড়েছে।

এ ছাড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী সাশ্রয়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সময়মতো উৎপাদনে আসেনি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগও প্রত্যাশিত গতি পায়নি। উৎপাদন সক্ষমতা থাকা বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ব্যয়ও বিদ্যুৎ খাতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিদ্যুৎ সংকট ধীরে ধীরে জটিল হয়েছে। ঘাটতি মোকাবিলায় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা হলেও এর বিপরীতে ক্যাপাসিটি পেমেন্টসহ বিভিন্ন ব্যয় বেড়েছে।

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলমের মতে, ব্যয়বহুল জ্বালানিনির্ভরতা এবং চাহিদার তুলনায় বেশি উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করাই সংকটকে দীর্ঘায়িত করেছে। তার মতে, বিদ্যুৎ খাতকে মুনাফাভিত্তিক খাতের পরিবর্তে সেবামূলক খাত হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সমাধানের পথ কী

বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা জরুরি। একই সঙ্গে গ্যাসনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎভিত্তিক ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম গ্যাসভিত্তিক বয়লারের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক বয়লার, ডিজেলচালিত যানবাহনের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক যান এবং ডিজেলচালিত সেচের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক সেচ ব্যবস্থার প্রসারের পরামর্শ দিয়েছেন। বাসাবাড়িতেও গ্যাসের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

এম শামসুল আলম কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যমান সক্ষমতা কাজে লাগানোর পাশাপাশি পারমাণবিক ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যে গুরুত্ব

বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিদ্যুৎ আমদানির পরিধি বাড়ানোর বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে ভারত ও নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করছে বাংলাদেশ।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৯ শতাংশ আমদানি করা হয়। আঞ্চলিক গ্রিডের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে ভারতসহ আশপাশের দেশগুলোর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ দ্রুত আমদানি করে দেশের ঘাটতি মোকাবিলা করা সম্ভব।

তার মতে, ভারতের গ্রিড ব্যবহার করে নেপাল থেকে আরও বেশি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ রয়েছে। এতে শিল্পসহ বিভিন্ন খাতের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে সহায়তা মিলতে পারে।

এম শামসুল আলম ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তির ট্যারিফ কমানোর বিষয়ে পুনরায় আলোচনার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে প্রতিযোগিতামূলক দামে বিদ্যুৎ বা জ্বানি আমদানির সুযোগ কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সংকট কাটাতে শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না। নিশ্চিত করতে হবে জ্বালানি সরবরাহ, বাড়াতে হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, সম্প্রসারণ করতে হবে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য এবং কমাতে হবে ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা। এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলেই টেকসইভাবে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad