হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন একটি অস্থায়ী নৌপথে সম্মত হয়েছে ইরান ও ওমান। তবে যুক্তরাষ্ট্র জুনে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তির প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ না করা পর্যন্ত কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে পুরোপুরি উন্মুক্ত করা হবে না বলে জানিয়েছে তেহরান।
মঙ্গলবার ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি এ তথ্য জানান। এর আগে একই দিন তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদির বৈঠকে প্রণালিতে অস্থায়ী নৌপথ চালুর বিস্তারিত কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়।
গারিবাবাদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, ওমানের সঙ্গে সম্মত হওয়া নতুন নৌপথের প্রবেশমুখ ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্য দিয়ে হবে এবং বের হওয়ার পথের একটি অংশও ইরানের জলসীমা দিয়ে যাবে। প্রস্তাবিত এই নৌকরিডরের প্রস্থ হবে প্রায় ৭ মাইল বা ১১ দশমিক ৩ কিলোমিটার। তিনি বলেন, ওমানের সঙ্গে সম্মত নৌপথটি একটি অস্থায়ী পথ।
ইরান ও ওমান—উভয় দেশই হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় রাষ্ট্র। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। তবে ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রণালিতে অধিকাংশ জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে।
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আল-বুসাইদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, দুই দেশ শিগগিরই নতুন নৌকরিডর ঘোষণা করতে পারবে বলে তিনি আশা করছেন। ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা এবং এর স্থায়ী সমাধানও ধাপে ধাপে নির্ধারণ করা হবে বলে জানান তিনি।
দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে কারিগরি আলোচনা হবে। এতে তথ্য আদান-প্রদান, নৌ-চলাচল এবং নিরাপত্তা সেবা পরিচালনার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
মাইন অপসারণ নিয়ে আলোচনা
হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণের বিষয়টিও ইরান ও ওমানের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তেহরান জলপথটি বন্ধ করে দেওয়ার পর প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য নিজস্ব জলসীমা দিয়ে একটি বিকল্প পথ ঘোষণা করেছিল। ওই পথটি আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) অনুমোদিত ১৯৬৮ সালের ট্রাফিক সেপারেশন স্কিমের বাইরে ছিল। তেহরানের দাবি ছিল, আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত ওই নৌপথে মাইন পাতা হয়েছিল।
জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করার পর ওমান ও আইএমও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ওমানের উপকূল ঘেঁষে একটি নতুন নৌকরিডর ঘোষণা করে। তবে ইরান দাবি করে, কথিত ‘দক্ষিণাঞ্চলীয়’ এই নৌপথ এমওইউ লঙ্ঘন করছে। পরে ওই পথ ব্যবহারকারী জাহাজে হামলার ঘটনাও ঘটে, যার ফলে অন্তর্বর্তী সমঝোতা ভেঙে পড়ে।
এরপর বৃহত্তর শান্তি চুক্তির জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা স্থবির হয়ে যায়। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ থেকে গেছে। মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানায়, প্রণালির প্রবেশমুখের কাছে ওমানের আশ শিশাহ এলাকার কাছাকাছি একটি তেলবাহী ট্যাংকার অজ্ঞাত কোনো বস্তুর আঘাতে অচল হয়ে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি পূরণের দাবি
গারিবাবাদি স্পষ্ট করে বলেছেন, ওমানের সঙ্গে নতুন অস্থায়ী নৌপথে সমঝোতা হলেও ইরান হরমুজ প্রণালিকে এখনো ‘খোলা’ হিসেবে বিবেচনা করছে না। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি নাকচ করে বলেন, প্রণালির আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে সব মাইন সরিয়ে ফেলা হয়েছে, এমন দাবি শুধু বাজারকে শান্ত রাখার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মাইন শনাক্তকারী জাহাজগুলো ওই এলাকায় প্রবেশ করলে সেগুলো ‘খুব ভালো লক্ষ্যবস্তু’তে পরিণত হবে।
ইরানের এই কর্মকর্তা বলেন, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে জুনের সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ ছাড়ার বিষয়ও রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধেও দেশগুলোকে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প গত সপ্তাহে ইরানের বিরুদ্ধে ‘সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান’ চালানোর ঘোষণা দিয়ে দেশটির সঙ্গে ব্যবসা করা যেকোনো দেশের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেন।
গারিবাবাদি বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র নিজের সক্ষমতা নিয়ে ভুল ধারণা করছে। আগের ট্রাম্প প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা নীতি যেমন লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিল, নতুন পদক্ষেপও একই পরিণতির মুখে পড়বে বলে দাবি করেন তিনি।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায়, নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ‘ব্যর্থ হতে বাধ্য’ এবং সেগুলো মোকাবিলায় ইরানের নিজস্ব কৌশল রয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা

মোঃ রায়হান চৌধুরী,(নিজস্ব প্রতিবেদক)