ইন্টারনেট-টিভি বর্জন, বড় পরিবার—নিউইয়র্কের হাসিদিক ইহুদিদের ভিন্ন জীবনযাপন

  • প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৯ বিকাল
  • ১১২৪ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
আধুনিক বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নগরী নিউইয়র্ক। সেই শহরেই এমন একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বসবাস, যাদের জীবনযাপন আধুনিক নগরজীবন থেকে অনেকটাই আলাদা। কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন, সীমিত প্রযুক্তি ব্যবহার, নিজস্ব শিক্ষা ও সামাজিক কাঠামো এবং বড় পরিবার—সব মিলিয়ে হাসিদিক ইহুদিদের জীবনধারা স্বতন্ত্র।

সম্প্রতি তুরস্কের ইউটিউবার ও ভ্রমণবিষয়ক ভিডিও নির্মাতা মুহাম্মদ রুহি চেনেট তাঁর একটি ভিডিওতে এই সম্প্রদায়ের জীবনযাপন তুলে ধরেছেন। সেখানে সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁকে একাধিকবার জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি ইহুদি কি না। চেনেটের ভাষ্য অনুযায়ী, বাইরের মানুষের সঙ্গে তাদের সামাজিক যোগাযোগও বেশ সীমিত।

প্রযুক্তি ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ

চেনেটের ভিডিওতে বলা হয়, সম্প্রদায়ের অনেক সদস্য সাধারণ ইন্টারনেট ও টেলিভিশন ব্যবহার করেন না। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা বিধিনিষেধ। বিশেষভাবে তৈরি মোবাইল ফোন ও কম্পিউটারে ইন্টারনেটের বিভিন্ন সুবিধা সীমিত বা ফিল্টার করে দেওয়া হয়, যাতে ব্যবহারকারীরা অনুমোদিত সেবাগুলোই ব্যবহার করতে পারেন।

ভিডিওতে এক সদস্যকে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি জীবনে কখনো ইন্টারনেট ব্যবহার করেছেন কি না। উত্তরে তিনি এটিকে মানুষের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন। টেলিভিশন দেখার বিষয়েও একই ধরনের অবস্থান জানান তিনি।

এমনকি মাইকেল জ্যাকসন বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্দোর মতো বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিদের সম্পর্কেও তিনি জানেন না বলে জানান।

নিজস্ব সামাজিক ও সেবাব্যবস্থা

হাসিদিক সম্প্রদায়ের বিভিন্ন এলাকায় নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবী নিরাপত্তা ও সামাজিক সেবাব্যবস্থা রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এসব স্বেচ্ছাসেবী দল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো ভূমিকা পালন করে। রয়েছে নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স সেবাও।

সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ধর্মীয় আদালত বা ‘বেদ্রিন’ ব্যবস্থার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের কাছে যাওয়ার আগে রাব্বির সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করার সামাজিক রীতি রয়েছে বলে ভিডিওতে দাবি করা হয়।

এ ছাড়া ‘শালীনতা টহল’ নামে পরিচিত কিছু স্বেচ্ছাসেবী দল জনসমক্ষে সম্প্রদায়ের সদস্যরা নির্ধারিত পোশাকবিধি মেনে চলছেন কি না, তা পর্যবেক্ষণ করে।

ধর্মীয় শিক্ষায় বেশি গুরুত্ব

শিক্ষাব্যবস্থাতেও রয়েছে পৃথক কাঠামো। ছেলেদের ১৩ বছর বয়সে বার মিৎসভা সম্পন্ন হওয়ার পর তাদের পোশাক ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আসে। এরপর ধর্মীয় শিক্ষাই তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রচলিত একাডেমিক শিক্ষার তুলনায় ধর্মীয় শিক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

বড় পরিবারে গুরুত্ব

হাসিদিক সম্প্রদায়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য উচ্চ জন্মহার। ভিডিওতে সম্প্রদায়টির জনসংখ্যা প্রায় এক লাখ বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, উচ্চ জন্মহারের কারণে জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

সম্প্রদায় ছেড়ে আসা এক নারী, যিনি একসময় একজন রাব্বির স্ত্রী ছিলেন, তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি জানান, বিয়ের সাড়ে আট মাসের মধ্যে তাঁর প্রথম সন্তান এবং ১১ মাস পর দ্বিতীয় সন্তান জন্ম নেয়। বর্তমানে তাঁর ১০ সন্তান রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে বিরতি না দিলে তাঁর সন্তানের সংখ্যা ১৫-তে পৌঁছাতে পারত। সন্তান নেওয়ার বিষয়ে রাব্বির অনুমতিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় বলেও তিনি জানান।

বিবাহিত নারীদের চুল ঢাকার রীতি

সম্প্রদায়ের কিছু গোষ্ঠীতে বিবাহিত নারীদের চুল নিয়ে কঠোর ধর্মীয় রীতি অনুসরণের কথা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়, অনেক নারী মাথার চুল কামিয়ে রাখেন এবং বাইরে বের হওয়ার সময় উইগ বা ওড়না দিয়ে মাথা ঢেকে রাখেন। কেউ কেউ বাড়িতেও চুল আবৃত রাখেন।

দাম্পত্য জীবনেও নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিধিনিষেধ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শারীরিক স্পর্শ নিষিদ্ধ থাকে এবং এ সময় তারা হাতে হাতে জিনিসও আদান-প্রদান করেন না।

নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিসর

শুধু পারিবারিক ও ধর্মীয় জীবন নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সম্প্রদায়টির নিজস্ব কাঠামো রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে কেনাকাটা ও ব্যবসার ক্ষেত্রে নিজেদের সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিশুদের খেলনা ও অন্যান্য পণ্যও অনেক সময় তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে সামনে রেখে তৈরি করা হয়।

ধর্মীয় বিশ্বাস, কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধ, প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার এবং বড় পরিবার—সব মিলিয়ে নিউইয়র্কের হাসিদিক ইহুদিদের জীবনধারা আধুনিক নগরজীবনের মধ্যেও একটি স্বতন্ত্র সামাজিক পরিসর তৈরি করেছে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad