শরীয়াহর দৃষ্টিতে সম্পত্তি হস্তান্তর বিলের বিধান নিয়ে প্রশ্ন

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৮ বিকাল
  • ৩৮৩২ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এর একটি বিধান নিয়ে শরীয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন তুলেছেন মুফতি শরীফ মালিক। তাঁর মতে, পিতা-মাতা বা পিতামহ-মাতামহ সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করার পরও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তির ভোগদখল ও নিয়ন্ত্রণের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন—এমন বিধান ইসলামী আইনে হেবা বা সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তরের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এক নিবন্ধে তিনি বলেন, বয়স্ক পিতা-মাতার নিরাপত্তা ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে যে আইনগত পদ্ধতি গ্রহণ করা হবে, সেটিও শরিয়াহসম্মত হওয়া প্রয়োজন।

মুফতি শরীফ মালিকের মতে, ইসলামী ফিকহে হেবা বলতে জীবদ্দশায় কোনো বিনিময় ছাড়াই সম্পদের মূল মালিকানা অন্যের কাছে হস্তান্তরকে বোঝায়। হেবা সম্পন্ন হওয়ার পর কবজের মাধ্যমে গ্রহীতা সম্পত্তির মালিক হন। ফলে দাতা যদি মালিকানা হস্তান্তরের পাশাপাশি নিজের জন্য সম্পত্তির ওপর জীবনকালীন মালিকানাগত ভোগদখল ও নিয়ন্ত্রণের অধিকার সংরক্ষণ করেন, তাহলে হেবার মৌলিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

হেবা ও ব্যবহারাধিকারের পার্থক্য

তিনি উল্লেখ করেন, ইসলামী আইনে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর এবং শুধু ব্যবহার বা ভোগের অধিকার দেওয়া এক বিষয় নয়। মালিকানা হস্তান্তর হলে গ্রহীতা সম্পত্তির মালিক হন। অন্যদিকে, শুধু ব্যবহারাধিকার দেওয়া হলে মালিকানা মূল মালিকের কাছেই থাকে; এটিকে ‘আরিয়াহ’ ধরনের লেনদেন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ‘আমি এই বাড়িটি তোমাকে হেবা করলাম, তবে যতদিন আমি জীবিত থাকব ততদিন এর মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ ও পূর্ণ ভোগাধিকার আমার থাকবে’—এ ধরনের শর্ত হেবার প্রকৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ফিকহি বিশ্বকোষের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, হেবার সঙ্গে যুক্ত শর্ত বৈধ বা অবৈধ—দুই ধরনেরই হতে পারে। যে শর্ত হেবার মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী নয়, তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু যে শর্ত হেবার বিধান ও মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তা বাতিল হওয়ার কথা রয়েছে।

হাম্বলি মাজহাবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হেবাকৃত সম্পত্তির ব্যবহারাধিকার দাতার জন্য সংরক্ষণের বিষয়ে মত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে তাঁর দাবি, আলোচ্য আইনে অধিকারটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয়; বরং দাতার জীবনকাল পর্যন্ত। ফলে এটিকে হাম্বলি মাজহাবের ওই মতের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখার সুযোগ নেই।

‘উমরা’র উদাহরণ

সম্পত্তি হস্তান্তরের সঙ্গে জীবনকালীন অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে তিনি ইসলামী ফিকহের ‘উমরা’ বিধানের উদাহরণ টেনেছেন।

হযরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি কাউকে তার ও তার বংশধরদের জন্য ‘উমরা’ হিসেবে কোনো সম্পত্তি দিলে তা গ্রহীতারই হয়ে যায় এবং দাতার কাছে ফিরে যায় না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৪১৬৪)

ইমাম ইবনে কুদামাহ ও ইমাম নববী (রহ.)-এর আলোচনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, অধিকাংশ ফকিহের মতে ‘উমরা’ হেবা-জাতীয় লেনদেন এবং এর মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তরিত হয়।

মালিকানা ও জীবনকালীন ভোগাধিকার একসঙ্গে রাখার প্রশ্ন

মুফতি শরীফ মালিকের মতে, আলোচ্য বিধানের মূল প্রশ্ন হলো—একদিকে সম্পত্তির মালিকানা সন্তান বা নাতি-নাতনির কাছে হস্তান্তর করা এবং অন্যদিকে দাতার জীবদ্দশা পর্যন্ত সেই সম্পত্তির ওপর দাতার মালিকানাগত অধিকার বহাল রাখা যায় কি না।

তিনি বলেন, হেবা মূলত মালিকানা হস্তান্তরের চুক্তি। তাই মালিকানা অন্যের কাছে চলে যাওয়ার পর দাতার পূর্ববর্তী মালিকানাগত অধিকার একইভাবে বহাল রাখার সুযোগ থাকলে হেবার প্রকৃতিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

তাঁর মতে, দাতার উদ্দেশ্য যদি জীবদ্দশায় সম্পত্তির ব্যবহার করা হয়, তাহলে মালিকানা হস্তান্তর না করেও ব্যবহারাধিকার দেওয়ার পৃথক ব্যবস্থা ইসলামী আইনে রয়েছে। কিন্তু মালিকানা হস্তান্তরের পর একই সম্পত্তির ওপর দাতার জন্য মালিকানাগত পূর্ণ ভোগদখল সংরক্ষণ করা ভিন্ন বিষয়।

জীবনকালীন শর্তে হেবা কার্যকর হলে কী হবে

মুফতি শরীফ মালিকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দাতা যদি জীবদ্দশায় সম্পত্তির ভোগদখল বজায় রেখে মৃত্যুর পর হেবা কার্যকর করার শর্ত করেন, তাহলে সেটি কার্যত অসিয়তের পর্যায়ে চলে যেতে পারে।

আর অসিয়তের ক্ষেত্রে ইসলামী বিধান অনুযায়ী বৈধ ওয়ারিশের জন্য অসিয়ত কার্যকর হয় না। এ প্রসঙ্গে তিনি ‘ওয়ারিশদের জন্য অসিয়ত নেই’ মর্মে বর্ণিত হাদিস উল্লেখ করেছেন। (সুনানে বায়হাকি, হাদিস নং ১২৩১৬)

তাঁর মতে, সন্তান সাধারণত বৈধ ওয়ারিশ হওয়ায় এই পদ্ধতিতে মৃত্যুর পর সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়ার ব্যবস্থা অসিয়ত হিসেবে কার্যকর করার প্রশ্নও তৈরি হয়।

আইনের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আশঙ্কা

মুফতি শরীফ মালিক মনে করেন, আলোচ্য বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের ওপরও বিভিন্ন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তাঁর উল্লেখ করা সম্ভাব্য সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে—

ইসলামের মিরাছ বা উত্তরাধিকার নীতির সঙ্গে বিরোধ তৈরি হওয়া;

কোনো কোনো উত্তরাধিকারী বিশেষ সুবিধা পাওয়ায় অন্যরা বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা;

পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিরোধ ও কলহ বাড়ার সম্ভাবনা;

সন্তানদের মধ্যে সম্পদ বণ্টনে সমতার নীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা;

হেবাকৃত সম্পত্তি বিক্রি, বন্ধক বা অন্যভাবে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দাতার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা;

গ্রহীতার মৃত্যুর পর তার সন্তানদের সম্পত্তির অধিকার ও দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকারের মধ্যে জটিলতা তৈরি হওয়া।

পিতা-মাতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা

মুফতি শরীফ মালিক স্পষ্ট করে বলেন, তাঁর আপত্তি বয়স্ক পিতা-মাতার নিরাপত্তা বা তাঁদের বসবাসের অধিকার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যের বিরুদ্ধে নয়। ইসলামে পিতা-মাতার অধিকার ও তাঁদের সঙ্গে সদাচরণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে তাঁর মতে, একটি বৈধ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পদ্ধতিও শরিয়াহসম্মত হতে হবে। সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে এমন শর্ত আরোপ করা যাবে না, যার মাধ্যমে একই সঙ্গে গ্রহীতাকে মালিক করা এবং দাতার জন্য মালিকানাগত পূর্ণ ভোগদখল সংরক্ষণ করা হয়।

তিনি আরও বলেন, জীবদ্দশায় সন্তানদের সম্পত্তি দেওয়া হলে তা হেবা হিসেবে গণ্য হবে, মিরাছ হিসেবে নয়। এ ক্ষেত্রে সন্তানদের মধ্যে সমতা বজায় রাখা মুস্তাহাব। শরিয়তসম্মত বিশেষ কারণ থাকলে কম-বেশি করার সুযোগ থাকলেও কোনো বৈধ ওয়ারিশকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে কাউকে বেশি দেওয়া গুনাহের কারণ হতে পারে। এ বিষয়ে তিনি বাদায়েউস সানায়ে ও আল-কাওয়ানিনুল ফিকহিয়্যাহর উদ্ধৃতি দেন।

শরিয়াহর সঙ্গে সামঞ্জস্যের প্রশ্ন

নিবন্ধের উপসংহারে মুফতি শরীফ মালিক বলেন, সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত কোনো বিধান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু আইনটির উদ্দেশ্য বিবেচনা করলেই হবে না। দেখতে হবে, সম্পত্তির মালিকানা সত্যিই গ্রহীতার কাছে হস্তান্তরিত হচ্ছে কি না, হস্তান্তরের পর দাতার জন্য সংরক্ষিত অধিকারটি ব্যবহারাধিকার নাকি মালিকানাগত অধিকার এবং সেই অধিকার হেবার মূল কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।

তাঁর দাবি, আলোচ্য বিধানে একদিকে সম্পত্তির মালিকানা সন্তান বা অন্য উত্তরাধিকারীর কাছে হস্তান্তর এবং অন্যদিকে দাতার জীবনকাল পর্যন্ত সম্পত্তির ওপর পূর্ণ ভোগদখল ও নিয়ন্ত্রণ রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে। তাঁর দৃষ্টিতে, এই দ্বৈত অবস্থান হেবার মৌলিক সংজ্ঞা ও মালিকানা হস্তান্তরের শরয়ী নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

লেখক: মুফতি শরীফ মালিক, শিক্ষাসচিব ও সিনিয়র মুফতি, শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad