গতকাল ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। এতে অকটেন ও পেট্রলের দাম প্রথমবারের মতো ১৫০ টাকা ছাড়িয়েছে। হঠাৎ এই মূল্যবৃদ্ধিতে গরিব, সীমিত আয়ের মানুষ এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো নতুন করে ব্যয়ের চাপে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২০২২ সালে মূল্যস্ফীতি উঠেছিল ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে২০২২ সালের ৬ আগস্ট ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানো হয়। ৭ আগস্ট থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়। তখন ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৪ টাকা এবং কেরোসিনের দামও একই হারে বাড়ানো হয়েছিল। পেট্রলের দাম ৮৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা এবং অকটেনের দাম ৮৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়।
এর পরের মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে দাঁড়ায়। এর আগে প্রায় এক দশক ধরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশের নিচে ছিল। ২০২২ সালের জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়তে থাকে। এতে সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
চার বছরেও আগের অবস্থায় ফেরেনি মূল্যস্ফীতি২০২২ সালের আগস্টের পরবর্তী চার বছরে মূল্যস্ফীতি আর সাড়ে ৭ শতাংশের নিচে নামেনি। এ সময়ে কয়েক দফা জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধের কারণে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন, আমদানি ব্যয় ও জাহাজভাড়া বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার প্রভাব পড়ে দেশের বাজারে।
এর সঙ্গে দেশের ডলার–সংকটও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে ওঠে, যা ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের পর সর্বোচ্চ। ওই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।
বর্তমানে সার্বিক মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
এবারও বাড়তে পারে পণ্যের দামজ্বালানি তেলের নতুন মূল্যবৃদ্ধির ফলে পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে খরচ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন ব্যয় বাড়লে এর প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মানুষের আয় না বাড়লে মূল্যস্ফীতির বাড়তি চাপ গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষের ওপর বেশি পড়ে। মধ্যবিত্তরাও এতে বাড়তি চাপের মুখে পড়তে পারেন।
এদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন-ভাতা আগামী অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। এতে মানুষের হাতে অর্থের প্রবাহ বাড়তে পারে। আবার বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার কমিয়েছে। ব্যাংকঋণের সুদের হার কমলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়তে পারে। বাজারে অর্থের প্রবাহ বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতির ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভর্তুকি কমাতে দাম বাড়ানোর উদ্যোগজানা গেছে, জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি কমাতেই নতুন করে দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা যাতে অতিরিক্ত মুনাফা করতে না পারেন, সে বিষয়ে নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। ফলে দেশে দাম বাড়ানোর বিকল্প ছিল না। ইরান যুদ্ধের আগে যে দাম ছিল, বর্তমানে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম তার চেয়ে ৪৩ শতাংশ বেশি। দাম কম রাখা হলে সরকারকে বেশি ভর্তুকি দিতে হতো, কিন্তু সরকারের সেই আর্থিক সক্ষমতা নেই।
তবে তাঁর মতে, মাসের শুরুতে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের যে নীতি রয়েছে, তা এবার মানা হয়নি। মাসের ২০ তারিখের পর হঠাৎ করে দাম বাড়ানো হয়েছে।
জাহিদ হোসেন আরও বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বাজারে পণ্যের দামও বাড়বে। তবে এটিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে যাতে অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতিতে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া যায় কি না, সেটিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর মতো আর্থিক সক্ষমতা এই মুহূর্তে সরকারের নেই বলেও মনে করেন তিনি। তাই বিদ্যমান কর্মসূচির সুবিধা প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন এই অর্থনীতিবিদ।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক