স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, আমদানি কমে যাওয়ায় দর্শনা রেলইয়ার্ডে আগের সেই কর্মচাঞ্চল্য নেই। সিএন্ডএফ এজেন্ট, পরিবহন ব্যবসায়ী, চালক ও শ্রমিকদের অনেকেই কাজ হারিয়েছেন। আমদানি কার্যক্রম কমে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকছে সংশ্লিষ্ট অনেক কার্যালয়। ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হচ্ছে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও।
কমেছে ওয়াগন ও রাজস্বসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দর্শনা রেলপথ দিয়ে ৯ হাজার ৭৪৯টি ওয়াগনে ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৫৫৯ টন পণ্য আমদানি হয়। এতে রাজস্ব আয় হয় ২৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ওয়াগনের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৪৮৬টিতে। এ সময় আমদানি হয় ২ লাখ ৫২ হাজার ১০১ টন পণ্য এবং রাজস্ব আয় হয় ১১ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩ হাজার ৩১৫টি ওয়াগনে ৭ লাখ ১৫ হাজার টন পণ্য আমদানি হয়েছে। এতে রাজস্ব আয় হয়েছে ৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা।
অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আয় কমেছে প্রায় ১৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
রেলইয়ার্ডে কমেছে কর্মচাঞ্চল্যস্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলপথ দিয়ে মালবাহী ওয়াগনে ভারত থেকে পণ্য আমদানি করে ব্যবসায়ীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করতেন। এ পথে তুলনামূলক দ্রুত পণ্য আমদানি ও খালাস করা সম্ভব হওয়ায় একসময় রেলইয়ার্ডে দিনরাত ব্যস্ততা ছিল।
তবে নানা সমস্যার কারণে ব্যবসায়ীরা চাহিদা অনুযায়ী এলসির মাধ্যমে ভারত থেকে পণ্য আমদানি করতে পারছেন না। অল্প কিছু পণ্য আমদানি হলেও সেগুলোর অনেকটাই অন্যত্র খালাস হচ্ছে। ফলে দর্শনা রেলইয়ার্ড এলাকায় নেমে এসেছে সুনসান নীরবতা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কাজ কমে যাওয়ায় অনেক শ্রমিক ইয়ার্ড ছেড়ে চলে গেছেন। সিএন্ডএফ এজেন্ট, পরিবহন ব্যবসায়ী ও চালকদেরও অলস সময় কাটাতে হচ্ছে।
জাতীয় বাণিজ্যেও পরিবর্তনশুধু দর্শনা নয়, ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যেও পরিবর্তনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাবে, গত অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি কমেছে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ এবং রপ্তানি কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। তবে আমদানির ক্ষেত্রে বড় ব্যবধানে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে চীন।
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের বলেন, দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলস্টেশন ও শুল্ক স্টেশন দেশের বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের কূটনৈতিক সমস্যার কারণে পণ্য আমদানি কিছুটা স্থবির হয়েছে। দুই দেশের সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এ শুল্ক স্টেশনে আবারও কর্মচাঞ্চল্য ফিরবে বলে আশা করেন তিনি।
দর্শনা পৌরসভার সাবেক মেয়র ও সিএন্ডএফ এজেন্ট আতিয়ার রহমান হাবু বলেন, দর্শনা এলাকার অর্থনীতি অনেকাংশে পোলট্রি শিল্পনির্ভর। পোলট্রি ফিডসহ অন্যান্য পণ্য ব্রাজিল থেকে জাহাজে আসা এবং ভারতসহ আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ পথে আমদানি কম ছিল। তবে বর্তমানে আমদানি কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে। সামনে গমসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্য আমদানি হলে রাজস্ব আয়ও বাড়বে।
রাজস্ব বাড়ার প্রত্যাশাদর্শনা আন্তর্জাতিক রেলওয়ে স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট নাজমা ইয়াসমিন বলেন, দর্শনা আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ও রাজস্ব আদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ রুট দিয়ে ফ্লাইঅ্যাশ, ডিসেন্ট স্টোন চিপস, ডিওসি ও অন্যান্য পণ্যসহ ২ লাখ ৫২ হাজার ১০৪ টন পণ্য এসেছে। এ সময় বাংলাদেশ রেলওয়ের আয় হয়েছে ১১ কোটি ৪০ লাখ ৭ হাজার ৯৭৮ টাকা।
তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের আয় হয়েছে ৮ কোটি ২৮ লাখ ৬৭২ টাকা। আগের অর্থবছরের তুলনায় আয় কিছুটা কমেছে। তবে মালবাহী ট্রেনের সংখ্যা বাড়লে এবং পণ্য আমদানি স্বাভাবিক হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আয় আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
স্থানীয়দের মতে, দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলওয়ে শুল্ক স্টেশন দিয়ে আমদানি বাড়ানো গেলে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমার পাশাপাশি কর্মসংস্থান বাড়বে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক