সালমান শাহকে নিজের চোখে দেখতে না পারাকে জীবনের বড় আফসোস মনে করেন ঢাকা একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহমিদা জামান ইষ্টি। তার জন্মের প্রায় ছয় বছর আগেই মারা যান এই নায়ক। বাবা-মায়ের কাছ থেকেই ছোটবেলায় সালমান শাহ সম্পর্কে জানতে পারেন তিনি।
ইষ্টির ভাষায়, অল্প সময়ের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে সালমানের অসাধারণ সাফল্য এবং রহস্যজনক মৃত্যু তাকে নায়কের প্রতি আরও আগ্রহী করে তুলেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিছা নূজহাতের কাছেও সালমান শাহ ব্যতিক্রমী। তার মতে, অভিনয় থেকে ফ্যাশন—সব ক্ষেত্রেই তিনি সমসাময়িকদের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। একটি প্রজন্মের আইকন হিসেবে সালমানের ফ্যাশন, সিনেমা ও গান এখনো জনপ্রিয়।
চার বছরে ২৭ সিনেমা১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে রাতারাতি তারকা বনে যান সালমান শাহ। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে ২৭টি সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। এর অধিকাংশই ছিল ব্যবসাসফল।
স্বল্প সময়ের এই ক্যারিয়ারই তাকে দর্শকের মনে স্থায়ী আসন করে দেয়। মৃত্যুর ৩০ বছর পরও তার জনপ্রিয়তা অটুট থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে এই স্বল্পস্থায়ী অথচ সফল ক্যারিয়ারকে দেখছেন চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টরা।
সিলেটে হযরত শাহজালালের দরগাহসংলগ্ন কবরস্থানেও এখনো ভক্তদের উপস্থিতি দেখা যায়। এমনকি জামালপুর থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এক ভক্ত সালমান শাহর কবর জিয়ারত করতে সিলেটে এসেছিলেন।
চলচ্চিত্র গবেষক, নির্মাতা ও অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন রাজুর মতে, বাংলাদেশের বাস্তবতায় সালমান শাহকে ঘিরে তৈরি হওয়া ফ্যানডম বিরল। তার ফ্যাশন ও জীবনযাপনের নানা দিকও দর্শকেরা অনুসরণ করেছেন।
বাদ পড়েছিল ‘সালমান’ নাম, পরে সেটিই পরিচয়সিলেটের দাড়িয়াপাড়া এলাকায় অবস্থিত সালমান শাহ ভবনটি তার নানাবাড়ি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সেখানেই জন্ম নেন তিনি।
বাবা-মা তার নাম রেখেছিলেন চৌধুরী মোহাম্মদ সালমান শাহরিয়ার। ডাকনাম ছিল ইমন। বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা।
কুমিল্লায় স্কুলে ভর্তি করার সময় দীর্ঘ নাম নিয়ে জটিলতা দেখা দিলে শিক্ষকের পরামর্শে নাম ছোট করা হয়। তখন নাম থেকে ‘সালমান’ বাদ দেওয়া হয়েছিল।
অথচ পরবর্তী সময়ে সেই বাদ পড়া নামটিই হয়ে ওঠে তার পরিচয়ের প্রধান অংশ।
‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান তার নামের সঙ্গে ‘শাহ’ যুক্ত করেন। সালমানের মা নীলা চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, অভিনেতা নাসিরুদ্দীন শাহর প্রতি তার মায়ের ভক্তি এবং সালমান শাহরিয়ারের নামের ‘শাহরিয়ার’ অংশ থেকেই ‘শাহ’ নেওয়া হয়। এভাবেই পরিচিতি পান সালমান শাহ নামে।
ছোট পর্দা থেকে চলচ্চিত্রেসাংস্কৃতিক পরিবেশেই বেড়ে ওঠেন সালমান শাহ। তার নানা কামরুজ্জামান বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এ অভিনয় করেছিলেন। অভিনয়ে আসার ক্ষেত্রে নানার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন সালমান।
তার মা নীলা চৌধুরীও রেডিও ও টেলিভিশনে গান করতেন। মায়ের হাত ধরে আশির দশকের শুরুতে শিশুশিল্পী হিসেবে টেলিভিশনে অভিনয়ে অভিষেক হয় সালমানের।
পরবর্তীতে বিটিভির বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি বিজ্ঞাপনচিত্রেও মডেল হন তিনি।
আশির দশকের শেষ দিকে নির্মাতা আলমগীর কবির ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করলে রইস চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান সালমান শাহ। কিন্তু ১৯৮৯ সালে আলমগীর কবিরের আকস্মিক মৃত্যুর পর সিনেমাটির কাজ আর শেষ হয়নি।
এরপর আসে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’-এর সুযোগ। ১৯৯২ সালে পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান তাকে সিনেমাটির নায়ক হিসেবে প্রস্তাব দেন। প্রথমে বাবা-মা রাজি না হলেও ছেলের আগ্রহের কারণে পরে সম্মতি দেন।
১৯৯৩ সালের মার্চে সিনেমাটি মুক্তির পর ব্যাপক সাফল্য পায়। এরপরই ঢালিউডে নিজের অবস্থান শক্ত করে নেন সালমান শাহ।
২৫ বছর বয়সে আকস্মিক মৃত্যু১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে ঢাকার নিউ ইস্কাটনের বাসায় আকস্মিক মৃত্যু হয় সালমান শাহর। স্ত্রী সামিরা হককে নিয়ে ১১ তলার ওই ফ্ল্যাটে থাকতেন তিনি।
সেদিন সকালে বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী ছেলের সঙ্গে দেখা করতে বাসায় যান। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও দেখা না পেয়ে তিনি গ্রিনরোডের বাসায় ফিরে যান। পরে সকাল ১১টার দিকে সালমানের মা নীলা চৌধুরীকে দ্রুত ইস্কাটনের বাসায় যেতে বলা হয়।
সেখানে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা ফ্ল্যাটের খাটের ওপর সালমান শাহকে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে তাকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল এবং সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা জানান, হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।
মৃত্যুকে ঘিরে শুরু হয় রহস্যঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর সালমান শাহর লাশ এফডিসিতে নেওয়া হয়। পরে সিলেটে জানাজা শেষে হযরত শাহজালালের মাজারসংলগ্ন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
প্রথম ময়নাতদন্তে তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হলেও পরিবারের সদস্যরা তা মেনে নেননি। সালমানের মামা আলমগীর কুমকুম তার গলায় থাকা দাগ এবং আত্মহত্যায় ব্যবহৃত হয়েছে বলে উল্লেখ করা রশির মধ্যে অসামঞ্জস্যের কথা তুলে ধরেন।
এরপর একের পর এক তদন্ত হয়। সালমানের বাবা রমনা থানায় অপমৃত্যুর মামলা করেন। পরে সেটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করা হয়। তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি।
দাফনের প্রায় এক সপ্তাহ পর কবর থেকে লাশ তুলে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত করা হয় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। দ্বিতীয় ময়নাতদন্তেও আত্মহত্যার আলামত পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা জানান।
১৯৯৭ সালের নভেম্বরে সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করে। পরিবার ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে নারাজি জানায়।
পরে ২০০৩ সালে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ২০১৪ সালে দেওয়া প্রতিবেদনেও মৃত্যুকে অপমৃত্যু বলা হয়। এরপর পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় র্যাবকে।
২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বিউটিশিয়ান রাবেয়া সুলতানা রুবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিওতে সালমান শাহকে হত্যার দাবি করেন। তার স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন হত্যার সঙ্গে জড়িত বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরে অবশ্য ওই বক্তব্য প্রত্যাহার করেন রুবি।
পরবর্তীতে তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন দেয় সংস্থাটি। সেখানেও সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। পরিবারের দাবি, তার একটি সুইসাইড নোটও পাওয়া গিয়েছিল। তবে পরিবার পিবিআইয়ের প্রতিবেদনও প্রত্যাখ্যান করে।
২৯ বছর পর হত্যা মামলাপরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালে ঢাকার একটি আদালত সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা গ্রহণ করেন এবং পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন।
এরপর গত বছরের অক্টোবরে সালমানের মামা আলমগীর কুমকুম রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, সাবেক শাশুড়ি লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ বাহাই, অভিনেতা আশরাফুল হক ডন, বিউটিশিয়ান রাবেয়া সুলতানা রুবি ও রেজভী আহম্মেদসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়।
মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছে সিআইডি। তদন্তের স্বার্থে দেশে থাকা আসামিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। গত ৯ আগস্ট বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করলে অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহ বলেন, এটি বহুল আলোচিত মামলা। এর আগে বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছে এবং প্রতিবারই বাদীপক্ষ নারাজি জানিয়েছে। প্রকৃত সত্য উদঘাটনে পেশাদারিত্বের সঙ্গে তদন্ত চলছে।
অভিযুক্তদের বক্তব্যসালমান শাহর মৃত্যুর জন্য শুরু থেকেই তার সাবেক স্ত্রী সামিরা হককে দায়ী করে আসছে তার পরিবার। তবে সামিরা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
২০২৪ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে মৃত্যুর আগে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়েছিল বলে জানান তিনি। এর কেন্দ্রে ছিলেন অভিনেত্রী শাবনূর।
সালমান শাহ ও শাবনূরের জুটি দর্শকের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। তাদের সম্পর্ক নিয়ে প্রেম ও বিয়ের গুঞ্জনও ছড়িয়েছিল। তবে বিভিন্ন সময়ে শাবনূর বলেছেন, কাজের সম্পর্কের বাইরে সালমানের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না।
অভিনেতা আশরাফুল হক ডনও হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, সালমান শাহ যেদিন মারা যান, সেদিন তিনি ঢাকার বাইরে ছিলেন।
অন্য আসামি রেজভী আহম্মেদও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তাকে যা বলা হয়েছিল, তিনি সেটিই করেছিলেন। অন্য আসামিদের অধিকাংশ বর্তমানে বিদেশে অথবা আত্মগোপনে থাকায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কেন এখনো জনপ্রিয় সালমান শাহ?সালমান শাহর জনপ্রিয়তার অন্যতম বড় কারণ তার ফ্যাশন। পোশাক, চুলের স্টাইল, হাঁটা-চলা ও অঙ্গভঙ্গি—সবকিছুই অনুকরণ করতেন ভক্তরা। এমনকি মৃত্যুর পরও তার স্টাইল অনুসরণ করেন অনেকে।
চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের মতে, তার জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারে অসাধারণ সাফল্য। মৃত্যুর সময়ও তার হাতে ছিল প্রায় ডজনখানেক সিনেমা। কয়েকটির শুটিং চলছিল।
পরিচালক ড. মতিন রহমান বলেন, সালমান শাহর আকস্মিক মৃত্যু চলচ্চিত্র অঙ্গনে বড় শূন্যতা তৈরি করেছিল। তার নিজের একটি সিনেমারও অর্ধেক শুটিং বাকি ছিল। সালমানের মৃত্যুর পর সেটি বাদ দিতে হয়।
চলচ্চিত্র গবেষক ড. জাকির হোসেন রাজুর মতে, সালমান শাহর অভিনীত সিনেমায় কিশোর ও তরুণদের রোমান্স, ফ্যাশন ও জীবনযাপনের প্রতিফলন ছিল। ফলে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও তিনি সহজেই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছেন।
তার মতে, সালমান ছিলেন একজন ‘ট্রেন্ডসেটার’। অভিনয়, ফ্যাশন ও ব্যক্তিত্ব—সব মিলিয়ে তিনি এমন একটি নিজস্ব স্টাইল তৈরি করেছিলেন, যা এখনো দর্শকদের আকর্ষণ করে।
পরিচালক ড. মতিন রহমানের মতে, তার অস্বাভাবিক মৃত্যুও দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তার একটি কারণ। স্বাভাবিক মৃত্যু হলে হয়তো ৩০ বছর পরও তাকে নিয়ে এত আলোচনা হতো না।
তিন দশক পরও সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্যের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। একদিকে নতুন প্রজন্ম তার সিনেমা, অভিনয় ও ফ্যাশন নিয়ে আগ্রহী; অন্যদিকে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ভক্ত ও পরিবারের কৌতূহলও রয়ে গেছে।
মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার। অভিনীত ২৭টি সিনেমা। এরপর মাত্র ২৫ বছর বয়সে আকস্মিক মৃত্যু। এত অল্প সময়ে যে জনপ্রিয়তা ও প্রভাব তৈরি করেছিলেন সালমান শাহ, তিন দশক পরও তা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তাকে আলাদা এক অবস্থানে রেখেছে।

প্রথম দর্পণ,বিনোদন ডেক্স