ঝটিকা মিছিল ঘিরে বিএনপি-জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১৯ দুপুর
  • ২৬৩২ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
রাজধানীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কথিত ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শুরু হয়েছে। বিএনপির কয়েকজন নেতা এসব তৎপরতার পেছনে জামায়াতের ‘গোপন সমঝোতা’ থাকার অভিযোগ তুলেছেন। বিপরীতে জামায়াতের নেতাদের দাবি, সরকারের কোনো অংশের ‘সবুজ সংকেত’ ছাড়া নিষিদ্ধ একটি দলের পক্ষে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের কর্মসূচি চালানো কঠিন।

তবে দুই দলের এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন তদন্তের ফলাফল প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে রাজনৈতিক দোষারোপের পাশাপাশি ঝটিকা মিছিল, বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলোর প্রকৃত নেপথ্য ও দায়ীদের শনাক্ত করাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

গুলশানের ঘটনায় ১৭৯ গ্রেপ্তার

গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশান-১ এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের একটি ঝটিকা মিছিলকে কেন্দ্র করে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন ওই মিছিলে অংশ নিয়েছিল। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গেলে মিছিল থেকে ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। পরে পুলিশ রাবার বুলেট ছোড়ে এবং ঘটনাস্থল থেকে অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয়। মামলায় ১১৮ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৮০ থেকে ১০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওই মামলায় ১৭৯ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। পরে গ্রেপ্তারদের কয়েকজনকে রিমান্ডে নেওয়া হয় এবং ১০ দিনের রিমান্ড শেষে ২৪ জনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। ১২ সেপ্টেম্বরের বিভিন্ন প্রতিবেদনে গুলশানের মিছিল ও গ্রেপ্তারের তথ্যও পাওয়া যায়।

গুলশানের ঘটনার পর ১৬ সেপ্টেম্বর গুলশান বিভাগের উপকমিশনার এম তানভীর আহমেদ ও গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দাউদ হোসেনকে প্রত্যাহার করে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।

থামেনি বিচ্ছিন্ন মিছিল-বিস্ফোরণ

গুলশানের ঘটনার পরও রাজধানীতে বিচ্ছিন্নভাবে ঝটিকা মিছিল ও সহিংসতার ঘটনা ঘটতে থাকে। ১৯ সেপ্টেম্বর সকালে গুলিস্তানের জাতীয় স্টেডিয়ামের ১ নম্বর গেটের সামনে আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের আরেকটি মিছিলের চেষ্টা হয়। পুলিশ জানায়, ১০ থেকে ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে অংশগ্রহণকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

এর আগে ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণে এক অটোরিকশাচালক আহত হন। পরে ডিবি চারজনকে গ্রেপ্তার এবং তাদের কাছ থেকে চারটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধারের কথা জানায়। পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য।

একই দিনে রাজধানীর অন্তত সাতটি এলাকায় ১৪টি ককটেল বিস্ফোরণের তথ্য পাওয়া যায়। কাফরুল থানার সামনে একটি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। পরদিন যাত্রাবাড়ী ও কমলাপুরসহ কয়েকটি এলাকায় বিস্ফোরণ এবং মিরপুর-১, মধ্য বাড্ডা ও কেরানীগঞ্জে যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

বিএনপির অভিযোগ জামায়াতকে ঘিরে

সাম্প্রতিক এসব ঘটনার নেপথ্যে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির কয়েকজন নেতা। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে আওয়ামী লীগের প্রতি জামায়াতের ‘পুরনো ভালোবাসা’ ফিরে আসার কথা বলেন। পরে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি আওয়ামী লীগকে রাজপথে নামার সাহস দেওয়ার ক্ষেত্রে জামায়াতের সঙ্গে ‘গোপন সমঝোতা’র অভিযোগ তোলেন।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও জামায়াতের কিছু কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগকে উৎসাহিত করছে বলে মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলা করে কেউ সাময়িক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করলে এর প্রভাব পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর পড়তে পারে।

তবে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল আওয়ামী লীগের এসব ঝটিকা মিছিলকে বড় কোনো রাজনৈতিক শক্তির প্রকাশ হিসেবে না দেখার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, বিপুল জনসংখ্যার দেশে ১০০ থেকে ২০০ মানুষের আকস্মিক জড়ো হয়ে স্লোগান দিয়ে চলে যাওয়াকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই।

জামায়াতের পাল্টা দাবি

বিএনপির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার ১২ সেপ্টেম্বর বলেন, সরকারের কোনো ধরনের সমর্থন ছাড়া নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের ঝটিকা কর্মসূচি চালানো কঠিন।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সক্রিয় থাকার পরও নিষিদ্ধ একটি দল কীভাবে বারবার প্রকাশ্যে মিছিল করার সুযোগ পাচ্ছে। এ থেকে তিনি সরকারের কোনো অংশের ‘সবুজ সংকেত’ থাকার অভিযোগ করেন। একই বক্তব্যের বিষয়ে অন্যান্য প্রতিবেদনেও একই ধরনের দাবি উঠে এসেছে।

জামায়াতের মুখপাত্র ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরও আওয়ামী লীগকে মদদ দেওয়ার অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল রাজপথে ছিল। এখন নিষিদ্ধ দলের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

বাড়ানো হয়েছে নজরদারি

রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের বাইরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—নিষিদ্ধ দলের নেতা-কর্মীরা কীভাবে বারবার রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আকস্মিকভাবে জড়ো হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

১৮ ও ১৯ সেপ্টেম্বরের ধারাবাহিক বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের পর রাজধানীতে ২৭৬টি চেকপোস্ট বসানোর কথা জানিয়েছে পুলিশ। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও এলাকায় অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি মোটরসাইকেলের ওপরও নজরদারি বাড়ানো হয়। বিভিন্ন ঘটনায় তেজগাঁও ও মিরপুর বিভাগে ১২৭ জনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটকের কথাও জানিয়েছে পুলিশ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্য বড় কর্মসূচির বদলে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে আকস্মিক কর্মসূচির চেষ্টা করছে। গোয়েন্দা নজরদারিতে গোপন বৈঠক ও অনলাইন যোগাযোগের তথ্য পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

তদন্তেই পরিষ্কার হবে নেপথ্য

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ এসব ঘটনাকে গোয়েন্দা তৎপরতার দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিচ্ছিন্ন কিছু ককটেল বিস্ফোরণকে সরাসরি গোয়েন্দা ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়; গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আরও বড় ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিষিদ্ধ দলের তৎপরতা নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের পারস্পরিক অভিযোগ চলতে থাকলে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি আড়ালে পড়ে যেতে পারে। রাজনৈতিক দলের বক্তব্যের পরিবর্তে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিটি ঘটনার দায় নির্ধারণ করা জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী গণপরিবহনে অগ্নিসংযোগসহ ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অভিযোগকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক দোষারোপের বাইরে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সতর্ক হওয়ার পাশাপাশি জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এস এম আলী রেজার মতে, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মাধ্যমে এ ধরনের পরিস্থিতির সমাধান হবে না। নিষিদ্ধ দলের বিরুদ্ধে নৈরাজ্যকর কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকলে তা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ঠেকাতে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) রাজধানীতে বিক্ষোভ করেছে। দলটির নেতা-কর্মীরা সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিভিন্ন স্লোগান দেন।

সব মিলিয়ে গত দুই সপ্তাহে রাজধানীতে ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ধারাবাহিক ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গুলশানের মিছিল থেকে ১৭৯ জন গ্রেপ্তার, এরপর গুলিস্তানে মিছিলের চেষ্টা এবং বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগ—এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন, নাকি সমন্বিত কোনো তৎপরতার অংশ, তা এখনো তদন্তসাপেক্ষ। তবে রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যেই রাজধানীতে নিরাপত্তা ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এসব ঘটনার প্রকৃত নেপথ্য তদন্তেই স্পষ্ট হওয়ার কথা।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad