ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তদন্তেও কয়েকটি হিসাবে সন্দেহজনক লেনদেন, নিজেদের মধ্যে ইউনিট কেনাবেচা এবং পর্যাপ্ত অর্থ না থাকা সত্ত্বেও ইউনিট কেনার সুযোগ দেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। আলোচনায় থাকা ফান্ডগুলো হলো—এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, পিএফ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এমবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড এবং ফার্স্ট প্রাইম ফাইন্যান্স মিউচুয়াল ফান্ড।
লভ্যাংশ নেই, দর বেড়েছে ৮৪ থেকে ২৩৭ শতাংশতথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চার ফান্ডের সর্বশেষ লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছে ২০২৩ সালে। ওই বছর এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট ও পিএফ ফার্স্ট ৩ শতাংশ করে, এমবিএল ফার্স্ট ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ফার্স্ট প্রাইম ফাইন্যান্স মিউচুয়াল ফান্ড ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দেয়। এরপর আর কোনো লভ্যাংশ দেয়নি ফান্ডগুলো।
এরপরও গত ছয় মাসে এসব ফান্ডের ইউনিটের দর উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২৫ মার্চ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এমবিএল ফার্স্টের ইউনিটের দাম ৪ টাকা ২০ পয়সা থেকে বেড়ে ১০ টাকা ৬০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বেড়েছে ১৫২ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
একই সময়ে ফার্স্ট প্রাইম ফাইন্যান্স মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দর ১৯ টাকা ২০ পয়সা থেকে বেড়ে ৩৫ টাকা ৪০ পয়সায় উঠেছে। এতে দর বেড়েছে ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
পিএফ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দাম ৫ টাকা ৪০ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৮ টাকা ২০ পয়সা। ছয় মাসে দর বেড়েছে ২৩৭ দশমিক ০৪ শতাংশ। আর এক্সিম ব্যাংক ফার্স্টের ইউনিটের দর ৩ টাকা ৪০ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ৬ টাকা ৯০ পয়সা; বেড়েছে ১০২ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেনার প্রচারণাদরবৃদ্ধির সময়ে মো. আশরাফুল ইসলাম নামে এক বিনিয়োগকারীর বিভিন্ন পেইড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গ্রুপে মিউচুয়াল ফান্ড কেনার নির্দেশনা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। কোন ফান্ড কখন এবং কত দামে কিনতে হবে—এমন প্রচারণাও চালানো হয়েছে।
এমবিএল ফার্স্ট নিয়ে তাঁর একটি পোস্টে বলা হয়, ‘এটা বড় গেম হবে ইনশাআল্লাহ।’ তাঁর পরিচালিত একটি পেইড গ্রুপে বার্ষিক সদস্য ফি ৫ হাজার টাকা। সেখানে বাজার বিশ্লেষণ, শেয়ারের তালিকা এবং ফোনে পরামর্শ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, যথাযথ অনুমোদন ছাড়া এভাবে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত পরামর্শ দেওয়া আইনবহির্ভূত। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (রিসার্চ অ্যানালিস্ট) বিধিমালা, ২০১৩ অনুযায়ী নিবন্ধন ছাড়া বিনিয়োগসংক্রান্ত পরামর্শ প্রকাশের সুযোগ নেই।
বিভিন্ন গ্রুপে আশরাফুল দাবি করেছেন, তাঁর গ্রুপের ২ হাজার ৭০০-এর বেশি গ্রাহকের প্রায় ৩০০ কোটি টাকার তহবিল তাঁর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
এক্সিম ফার্স্টে ডিএসইর তদন্তএক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের দরবৃদ্ধি ও লেনদেনের বিষয়ে ৫ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত তদন্ত করে ডিএসই। তদন্তে দেখা যায়, শীর্ষ ক্রেতা ও বিক্রেতাদের বড় অংশই এরিনা সিকিউরিটিজের গ্রাহক। আশরাফুল ইসলামও ছিলেন ষষ্ঠ বৃহৎ ক্রেতা ও সপ্তম বৃহৎ বিক্রেতা।
এরিনা সিকিউরিটিজের একটি হিসাবে এক্সিম ফার্স্টের ৬৮ লাখ ৩৬ হাজার ৮০টি ইউনিট কেনা এবং ১৯ লাখ ৯৪ হাজার ১৬৮টি ইউনিট বিক্রি করা হয়। অন্য একটি হিসাবে ২৮ লাখ ৯২ হাজার ৬০০টি ইউনিট কেনা ও একই পরিমাণ ইউনিট বিক্রি করা হয়।
এ ছাড়া রহমান ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্টের একটি হিসাব থেকে ১৯ লাখ ৯০ হাজার ৬৫৯টি ইউনিট কেনা এবং একই পরিমাণ ইউনিট বিক্রি করা হয়েছে।
ডিএসইর তদন্তে আরও দেখা যায়, পর্যাপ্ত নগদ অর্থ না থাকা সত্ত্বেও দুটি গ্রাহকের হিসাবে প্রায় ১৭ লাখ টাকার ইউনিট কেনার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। প্রয়োজনীয় মার্জিন চুক্তি না থাকায় বিষয়টিকে ২০২৫ সালের বিএসইসি মার্জিন বিধিমালার ৬ নম্বর বিধির লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই টার্মিনাল থেকে নিজেদের মধ্যে লেনদেনতদন্তে ১৩ জুলাই অ্যাবাসি ইনভেস্টমেন্টসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি বিও হিসাব একই গ্রিন ডেল্টা সিকিউরিটিজ টার্মিনাল ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে তিন দফা লেনদেন করার তথ্যও পাওয়া যায়। এসব লেনদেনে মোট ১ লাখ ১৯ হাজার ইউনিট হাতবদল হয়।
ডিএসইর তদন্তে ঘটনাটিকে বাজারে কৃত্রিম লেনদেনের উপস্থিতি তৈরির ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক মালিকানায় বড় পরিবর্তনএক্সিম ফার্স্টের দর বাড়ার সময়ে ফান্ডটির মালিকানাতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়। জুন শেষে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা ইউনিটের অংশ ছিল ২৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। জুলাই শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ দশমিক ২৬ শতাংশে।
তবে আগস্ট শেষে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা ইউনিটের সংখ্যা কমে ২ কোটি ৭৭ লাখ ৫ হাজার ৭৭৬টিতে দাঁড়ায়। জুলাইয়ের তুলনায় এক মাসে তা কমেছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৬৯ হাজার ২২৪ ইউনিট। বিপরীতে আগস্ট শেষে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা ইউনিটের অংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ দশমিক ৬৯ শতাংশে।
জুনে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এক্সিম ফার্স্টের ইউনিট গড়ে ৩ টাকা ৪০ পয়সা থেকে ৩ টাকা ৫০ পয়সা দরে কিনেছিলেন। পরে এর একটি অংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৬ টাকা ১০ পয়সা থেকে ৬ টাকা ৯০ পয়সা দরে বিক্রি হয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারির দাবিদীর্ঘদিন লভ্যাংশ না দেওয়া এবং সম্পদের মূল্য কমার পরও কোনো ফান্ডের ইউনিটের দর দ্রুত বাড়া স্বাভাবিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন একটি ব্রোকারেজ হাউসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউনিট কেনার প্রচারণা এবং সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য থাকলে বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থার গভীরভাবে খতিয়ে দেখা উচিত।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান সম্প্রতি বলেন, পুঁজিবাজারের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর একটি মিউচুয়াল ফান্ড। অতীতে অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে এ খাতে সাধারণ মানুষের আস্থা কমেছে। সেই আস্থা ফেরাতে প্রতিটি মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য কিছু ‘কি-পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর’ (কেপিআই) নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক