ছয় দফা না মানলে সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন: ১১ দল

  • প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স
  • আপলোড সময় : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৩৭ দুপুর
  • ৪৯১৫ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com.monirulbd.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ ছয় দফা দাবি দ্রুত মেনে নেওয়ার জন্য সরকারকে কঠোর বার্তা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। দাবি বাস্তবায়ন না হলে পর্যায়ক্রমে লংমার্চ ও ঢাকায় মহাসমাবেশের পর সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জোটের নেতারা।

শনিবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ লংমার্চ শেষে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে আয়োজিত সমাপনী সমাবেশে এ হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

তিনি বলেন, গণভোটের রায় অস্বীকার করে সরকার দেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে অপমান ও প্রতারিত করেছে। জনগণের রায় বাস্তবায়ন করতেই হবে। সংসদের ভেতরে সবকিছুর সমাধান করতে চেয়েছিলাম, রাজপথে আসতে চাইনি। কিন্তু সরকারই আমাদের রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ছয় দফা কোনো দলের ব্যক্তিগত দাবি নয়, এটি জনগণের দাবি। সরকারকে সতর্ক করতেই এবারের লংমার্চ। পরবর্তী কর্মসূচি আরও কঠোর হবে। বিরোধী দলকে কোনো ধরনের লোভ বা টোপ দিয়ে দমিয়ে রাখা যাবে না।

তিনি আরও বলেন, বিগত আন্দোলনে অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, অনেকে গুম হয়েছেন এবং আয়নাঘরে বন্দি ছিলেন। সেই ত্যাগের কথা ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। জনগণ কোনো ‘শিশু সরকারকে’ ভোট দেয়নি; তারা ওয়াদা শুনে ভোট দিয়েছে।

সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, একের পর এক ভুল করবে আর বিরোধী দল বসে থাকবে—এটা হতে দেওয়া হবে না। খুব শিগগিরই বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি আসবে। ফ্যাসিবাদ, অপরাধী, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ ও আধিপত্যবাদীরা এই লড়াইয়ে পরাজিত হবে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ জনপ্রতিনিধির পরিবর্তে প্রশাসক বসিয়ে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যায় না। বিএনপি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে দেশ পরিচালনার কথা বলেছিল। এখন প্রশাসক হিসেবে যাদের বসানো হয়েছে, তারা কি জনগণের ভোটে নির্বাচিত?

সংসদ অকার্যকর বলেই রাজপথে: নাহিদ

সমাবেশে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমান সংকটের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়ী। সংসদ কার্যকর করা, সংবিধান সংস্কার কমিশনের শপথ এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হলে বিরোধী দলকে রাজপথে নামতে হতো না।

তিনি বলেন, সরকার সংসদকে অকার্যকর করে রেখেছে। তাই জনগণের সঙ্গে রাজপথে আন্দোলনে থাকতে হচ্ছে। দেশের মানুষ ভালো নেই। তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট রয়েছে। সরকার সবদিক থেকে ব্যর্থ হয়েছে। সময় থাকতে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে দায়িত্বশীলভাবে দেশ পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, শেখ হাসিনার দুঃশাসন থামাতে মানুষ ১৬ বছর অপেক্ষা করেছে। বর্তমান সরকারের জন্য জনগণ পাঁচ বছরও অপেক্ষা করবে না।

‘বিএনপি সরকারের পরিবর্তন চায় মানুষ’

সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, দেশের মানুষ বিএনপি সরকারের পরিবর্তন চায়। দলীয় লোকজনকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বিএনপি সরকারের সঙ্গে বাকশালের কোনো পার্থক্য নেই।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে সংবিধান সংস্কারের আন্দোলন সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেবে।

সমাবেশে ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, গণভোটের রায়সহ ছয় দফা দাবি বাস্তবায়ন না করলে সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারবে না।

এ ছাড়া বক্তব্য দেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, যুগ্ম মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহান, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুছা বিন ইজহারসহ জোটের অন্যান্য নেতারা।

শাপলা চত্বর থেকে লংমার্চ

শনিবার সকাল ৭টায় রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ শুরু হয়। সাড়ে ৮টার দিকে গাড়িবহর চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করে।

উদ্বোধনী সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের অধিকার আদায়ে সংসদ ও রাজপথে সমান্তরালভাবে আন্দোলন চলবে। ছয় দফার পাশাপাশি চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও জানান তিনি।

১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ছয় দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেওয়া হবে না। নাহিদ ইসলাম বলেন, লংমার্চে বাধা দেওয়া হলে ছয় দফা থেকে এক দফা দাবিতে আন্দোলন আরও জোরালো হবে।

পথে পথে জনসমাগম

লংমার্চের গাড়িবহর নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর, কুমিল্লার নিমসার, পদুয়ার বাজার ও চৌদ্দগ্রাম, ফেনীর মহিপাল এবং চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুণ্ডে পথসভা করে।

কাঁচপুরে বৃষ্টি উপেক্ষা করে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী পথসভায় অংশ নেন। সেখানে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে পথসভাটি জনসমাবেশে রূপ নেয়। সেখানে কুমিল্লাকে বিভাগ করার দাবিও তোলা হয়। ডা. শফিকুর রহমান দ্রুত এ বিষয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরুর আহ্বান জানান।

ফেনীর মহিপালে পথসভায় ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। নাহিদ ইসলাম বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন না হওয়ায় দেশ উল্টোপথে চলছে।

বিকেলে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে লংমার্চের শেষ পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী সেখানে জড়ো হন।

লালদীঘিতে জনস্রোত

শনিবার দুপুর থেকেই চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাকর্মীরা লালদীঘি ময়দানে আসতে শুরু করেন। বিকেল ৩টার আগেই সমাবেশস্থল পূর্ণ হয়ে যায়। নেতাকর্মীরা গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।

সমাবেশ ঘিরে লালদীঘি ও আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে সমাবেশ শেষ হয়।

জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শান্তিপূর্ণভাবে লংমার্চ শেষ হয়েছে। তবে পথে কয়েকটি গাড়ি ছোটখাটো দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।

সামনে আরও তিন লংমার্চ

গত ৬ আগস্ট রাজধানীর মুক্তাঙ্গনে অবস্থান কর্মসূচি থেকে ছয় দফা দাবিতে ঢাকায় মহাসমাবেশ এবং চার বিভাগে লংমার্চের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের পর আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর, ৩১ অক্টোবর খুলনা-কুষ্টিয়া এবং ২১ নভেম্বর ট্রেনযোগে সিলেট অভিমুখে লংমার্চ করার কথা জানিয়েছে ১১ দলীয় ঐক্য। সবশেষে ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে ঢাকায় মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

জোটের ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad