বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি এখন নারী। পোশাক শিল্প, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, শিক্ষা, ব্যাংকিং, তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা—প্রতিটি খাতেই নারীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। তবে সাফল্যের এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। কর্মক্ষেত্রের বৈষম্য, সামাজিক কুসংস্কার, নিরাপত্তা সংকট, পারিবারিক দায়িত্ব এবং পেশাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই তারা নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন।
পোশাকশিল্পের শ্রমিক রাবেয়া খাতুনের ভাষায়, কর্মপরিবেশ আগের তুলনায় উন্নত হলেও এখনও নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও ন্যায্য মজুরি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে মাতৃত্বকালীন সুবিধা বাস্তবায়নে অনেক প্রতিষ্ঠানে অনীহা দেখা যায়, যা নারী শ্রমিকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পুলিশের কনস্টেবল সুমাইয়া ইসলাম শিমলা জানান, দায়িত্ব পালনের শুরুতে সামাজিক কটূক্তির মুখোমুখি হলেও পেশাগত নিষ্ঠা ও সহকর্মীদের সহযোগিতায় তিনি এগিয়ে গেছেন। বর্তমানে থানাগুলোতে নারী পুলিশের উপস্থিতি নারীদের আইনি সহায়তা গ্রহণকে আরও সহজ ও নিরাপদ করেছে।
শিক্ষকতা পেশায় দুই দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সোনিয়া সাহানী মনে করেন, বর্তমানে শিক্ষকদের দায়িত্ব শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, প্রশাসনিক কাজ এবং শিক্ষার্থীদের নৈতিক বিকাশের বাড়তি দায়িত্বও বহন করতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বিত সহযোগিতা জরুরি।
ব্যাংক কর্মকর্তা হাসিনা মমতাজ বলেন, ব্যাংকিং খাতে নারীদের জন্য পেশাগত উন্নতির পথ এখনও অনেক ক্ষেত্রে কঠিন। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, বদলিজনিত অনিশ্চয়তা এবং ডে-কেয়ার সুবিধার অভাব নারীদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। তবে সঠিক সময় ব্যবস্থাপনা ও পারিবারিক সহযোগিতা এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক ভূমিকা রাখে।
ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ শ্যামলী আক্তারের জীবনগল্প প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি। পোশাক কারখানার কর্মী থেকে ডিজিটাল দক্ষতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তিনি দেখিয়েছেন, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ নারীদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। তবে ফ্রিল্যান্সিং খাতে সামাজিক স্বীকৃতি ও নীতিগত সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
মনোবিজ্ঞানী সামছুন নাহার বলেন, কর্মক্ষেত্রে নারীদের সাফল্যের পাশাপাশি মানসিক চাপও বাড়ছে। কর্মপরিবেশে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায্য মূল্যায়ন এবং হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে নিয়মিত বিশ্রাম, শরীরচর্চা, ভ্রমণ এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার কাউন্সেলিং গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীর ক্ষমতায়ন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি। কর্মক্ষেত্রে সমঅধিকার, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিধারা আরও শক্তিশালী হবে।
সংগ্রাম, সাহস ও আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে এগিয়ে চলা এসব নারী আজ প্রমাণ করেছেন—সুযোগ পেলে নারীরা শুধু নিজেদের জীবনই বদলান না, বদলে দিতে পারেন সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎও। :::

শাহিন রেজা,মাল্টিমিডিয়া ইনচার্জ